কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু, উদ্ধারকর্মীদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার দৈয়ারা গ্রামে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে, যা আজ রোববার বেলা ১১টায়ও ভয়াবহ দৃশ্য উপস্থাপন করছে।
দুর্ঘটনাস্থলের মর্মান্তিক দৃশ্য
দুর্ঘটনাস্থলে বাসটি দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে, যেখানে রক্তের ছাপ, রক্তমাখা জুতা, খাবার, ফল, পানির বোতল, রান্না করা তরকারি ও মিষ্টির প্যাকেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখা যায়। রেললাইনের পাথর ও লোহার শিকেও রক্তের দাগ লেগে আছে, পাশাপাশি বাসের ভাঙা কাচ, জানালা অংশ ও ফ্যান পড়ে রয়েছে। বাসের ভেতরের বিভিন্ন সিটে মানুষের রক্ত লেগে থাকার চিহ্ন দেখা গেছে, যা দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে।
উদ্ধারকাজে স্থানীয়দের সাহসী ভূমিকা
দুর্ঘটনার পর ট্রেনটি বাসটিকে অন্তত ১ কিলোমিটার পথ টেনে নিয়ে দৈয়ারা গ্রাম পর্যন্ত আসে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। ২১ বছর বয়সী আরিফুল ইসলাম অন্তত ২০ জনকে বাস থেকে বের করার কাজে অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে নিহত একজনের মাথা খুঁজে পাই, পরে তাঁর দেহ খুঁজতে গিয়ে আঁতকে উঠি। রক্তে পুরো বাস ভেসে গিয়েছিল, কয়েকজন তখনো বেঁচে ছিলেন এবং শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এক বৃদ্ধের দুই পা ভেঙে আলাদা হয়ে গেছিল, যা দেখে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ ও মানবিক সংকট
স্থানীয় লোকজন আরিফুল ইসলামের মাধ্যমে অভিযোগ করেন যে, দুর্ঘটনার সময় তারা অ্যাম্বুলেন্স, ৯৯৯ এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি, এবং প্রায় ২ ঘণ্টা পরে তারা আসে, যখন উদ্ধারকাজ প্রায় শেষ। ৪৭ বছর বয়সী মো. জামাল হোসেন, যিনি উদ্ধারকাজে অংশ নেন, বলেন, ‘এই ৪৭ বছরে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা দেখিনি।’ তিনি উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার পর তাঁর শরীরের সব কাপড় রক্তে ভিজে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
উদ্ধারকর্মীদের হৃদয়বিদারক স্মৃতি
বিজয় দেবনাথ নামের আরেক উদ্ধারকর্মী বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ লেগেছে যখন একজন নিহত শিশুকে কোলে নিয়ে নামিয়েছিলাম, তাঁর মগজ বের হয়ে গেছিল।’ জামাল হোসেন ট্রেনের আওয়াজ শুনে দৌড়ে এসে দেখেন যে ট্রেনের ইঞ্জিন বাসের ভেতরে ঢুকে আছে এবং দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ভেতর মানুষগুলো কাতরাচ্ছিল। এই ঘটনা স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য একটি গভীর মানবিক সংকট ও শোকের বার্তা বহন করে আসছে।



