নোয়াখালীর হাতিয়ায় নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর ঈদ: আনন্দহীন উৎসবের করুণ গল্প
দেশজুড়ে ঈদের উৎসবের আমেজে মুখরিত পরিবেশ। ঘরে ঘরে বাহারি খাবারের আয়োজন, নতুন পোশাকের রেশ। কিন্তু নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকার অনেক পরিবারের জন্য এই ঈদ আনন্দহীন ও কষ্টের। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো এসব মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, যেখানে ঈদের কোনো আয়োজনই নেই।
মহিমা বেগমের জীবনসংগ্রাম: ভিক্ষার উপর নির্ভরশীলতা
মেঘনা নদীর কূলঘেঁষা একটি সরকারি প্রকল্পের ঘরে নাতি-নাতনিদের নিয়ে থাকেন ৭০ বছর বয়সী মহিমা বেগম। প্রায় ২০ বছর আগে তাঁর স্বামী আবদুল খালেক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান, আর ফিরে আসেননি। এর মধ্যে তিনবার নদীভাঙনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ে সবারই বিয়ে হয়ে গেছে, এবং এখন ভিক্ষা করেই চলে তাঁর জীবন।
মহিমা বেগমের মেজ মেয়ে সাহেদা বেগমের স্বামী আলাউদ্দিন ১০ বছর আগে মারা যান। তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে দুইজন নানি মহিমার কাছে থাকে, বাকি দুইজন মায়ের সাথে চট্টগ্রামে গৃহকর্মীর কাজ করে। মহিমা বেগম এখন যে ঘরে থাকেন, সেটি মেঘনা নদী থেকে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিটার দূরে, যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তিনি এখনো সেখানেই বাস করছেন।
ঈদ কেমন কাটছে জানতে চাইলে মহিমা বেগম বলেন, ‘আমাগো জন্য ঈদ আসে নাই। সেমাই-চিনি কিছুই জোটে নাই। পুরান শাড়ি পরে আছি। ভিক্ষা কইরা ২০ টাকার দুই প্যাকেট লুডুস পাইছি, সকালে একটা ভেজে নাতি-নাতনিগো খাওয়াইছি।’ তিনি আরও জানান, ঈদের আগের দিন রোজা রেখেও ইফতারে কিছু জোটেনি, বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে চুলায় রান্না করতে পারেননি। না খেয়ে থেকেই দিন কাটিয়েছেন, এবং ঈদের দিন শুধু ভাত আর আগের দিনের বেগুন ভাজি খেয়ে দিন পার করেছেন।
সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ
মহিমা বেগমের অভিযোগ, ঈদ বা রমজান উপলক্ষে সরকারি কোনো সহায়তা তাঁদের কাছে পৌঁছায় না। তিনি বলেন, ‘আমি ভিক্ষা করি, এইডা সবাই জানে। কিন্তু কোনো কার্ড দেয় না। নেতারা নিজেদের লোকজনরে দেয়, বাড়িতে নিয়া যায়।’ এই ভাঙনকবলিত এলাকায় অধিকাংশ মানুষই নিঃস্ব, ফলে অন্যদের কাছ থেকে ভিক্ষা পাওয়ার সুযোগও সীমিত।
অন্যান্য পরিবারের করুণ দশা
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা মো. দুলাল নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে এখন স্ত্রী বিবি ফাতেমাকে নিয়ে এক প্রতিবেশীর আশ্রয়ে থাকেন। নদীতে জাল ফেলে সামান্য মাছ ধরে কোনো রকমে সংসার চালান। তাঁদের আশ্রয় দিয়েছেন সবুজা খাতুন, যার স্বামী সারোয়ার হোসেন ১৪ বছর আগে ক্যানসারে মারা গেছেন। এখন একমাত্র ছেলে সাকিবকে নিয়ে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন সবুজা খাতুন, যিনি নদীভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়েছেন এবং মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পান, তা দিয়েই জীবন চালান।
সবুজা খাতুনকে মা ডাকেন দুলালের স্ত্রী বিবি ফাতেমা। এখন যে ঘরটিতে তাঁরা থাকছেন, সেই ঘরটি একবার নদীভাঙনের মুখে পড়েছিল, তারপর সেখান থেকে ভেঙে এখন সরকারি প্রকল্পের একটি খাসজমিতে এনে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে নদীর দূরত্ব মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার, এবং এখন ঘরটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য নেই তাঁর।
ঈদ কেমন কাটল জানতে চাইলে সবুজা খাতুন বলেন, ‘আনগো জন্য কোনো আনন্দ নাই। আমরা কান্দা-কাড়িতে আছি, আনগো বিপদ-আপদে আমরাই আছি। আনগোর লাই এসব খুশি আইয়ে নো। আনগোর লাই কোনো আনন্দ আইয়ে নো। আনন্দ আইলে তো আমরা আনন্দ করতাম। নদীর কূলে এইভাবে পড়ি থাইকতাম না।’ তিনি আরও জানান, ঈদের দিন কোনো সেমাই-চিনি রান্না হয়নি, এবং সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
সুফিয়া খাতুনের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস
একই বাস্তবতা সুফিয়া খাতুনের (৫৭)। পাঁচ বছর আগে স্বামী আলতাফ হোসেন মারা যান, বড় দুই ছেলে আলাদা থাকেন, এবং ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। এখন তাঁর ঘরটি ভাঙনের ঝুঁকিতে, এবং অর্থাভাবে ঘর সরানোর সুযোগ নেই। ফলে নদীর পাড়েই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।
কেবল মহিমা বেগম, সবুজা খাতুন, সুফিয়া খাতুন নন, এখানকার অনেক পরিবারের গল্প এমনই। মেঘনা নদীতে বারবার বাড়িঘর, সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব এ মানুষগুলোর ঘরে আসে না ঈদ বা উৎসবের আনন্দ। তাঁদের জীবনযাত্রা নদীভাঙনের কবলে পড়ে ক্রমাগত সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে সরকারি সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব প্রকট।



