মোংলার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে ঈদের শোক ও শূন্যতা
মোংলার দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে ঈদের শোক

মোংলার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে ঈদের শোক ও শূন্যতা

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নিহত ১৪ জনের পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই। স্বজন হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি তিনটি পরিবার। প্রতিবেশীরাও শোকাহত হয়ে পড়েছেন।

আবদুর রাজ্জাকের বাড়িতে সুনসান নীরবতা

গত শুক্রবার বিকেলে মোংলা উপজেলা পরিষদের অদূরে ছত্তারলেনে আবদুর রাজ্জাকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। সড়ক দুর্ঘটনায় এই বাড়ির ৯ সদস্যকে হারানোর সপ্তাহ পার হলেও স্বাভাবিক হতে পারেননি স্বজনেরা।

এই বাড়ির আশরাফুল ইসলাম (জনি) বলেন, 'আমার কি আর ঈদ আছে! এক দুর্ঘটনা আমার সব শেষ করে দিয়েছে। বাবা, ভাই, স্ত্রী, তিন ছেলে-মেয়ে, বোন, বোনের ছেলে, ভাইয়ের নতুন বউ সবই হারিয়েছি। এখন শুধু আমার মা আর দুটি ভাই বেঁচে আছে। আমাদের আর ঈদ নেই, কখনো মাকে সান্ত্বনা, আবার কখনো কবর জিয়ারত—এভাবেই আমার দিন কাটছে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আশরাফুলের প্রতিবেশী মো. গনি সরদার বলেন, 'মামা (আশরাফুলের বাবা আবদুর রাজ্জাক) প্রতিবছর এলাকার মানুষকে ঈদের আগে খাবার দিতেন, কাপড় দিতেন, গ্রামের অনেক মানুষের জন্য টাকা পাঠাতেন। আর এই সময় পুরো বাড়ি ভরা লোকজন থাকত। আজ কেউ নেই, সব শেষ হয়ে গেছে।'

রেদোয়ান ইসলাম নামের আরেক প্রতিবেশী বলেন, 'রাজ্জাক কাকা ও তাঁর ছেলেদের সঙ্গে তারাবিহ ও ঈদের নামাজ পড়েছি দীর্ঘদিন। এবার ঈদ এসেছে, কিন্তু তাঁরা নেই। কেমন জানি একটা শূন্যতা হয় মনের মধ্যে।'

চালক নাইমের পরিবারের দুঃখগাঁথা

এদিকে স্বামীর রুহের মাগফিরাত কামনায় মোংলার ভাড়া বাসায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মাইক্রোবাসের চালক নাইমের স্ত্রী কবিতা আক্তার। একমাত্র মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে অথই সাগরে পড়েছেন তিনি। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম পুরুষকে হারানো এই পরিবারেও নেই ঈদ উৎসব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কবিতা আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী নাইম শেষবার যখন বাড়ি থেকে বের হন, তখন মেয়েকে বলেছিলেন ভাড়া শেষ করে এসে ঈদের কেনাকাটা করবেন। মেয়ে বাবাকে বলেছিল দুটি জামা কিনে দিতে হবে। নাইম আর বাড়িতে আসতে পারেননি। মেয়ে এখনো বোঝে না তার বাবা নেই। কিছুক্ষণ পরপর বাবার কথা জানতে চায়। আহাজারি করে কবিতা বলেন, 'আমার ঈদ তো ওই দিনই (দুর্ঘটনার) শেষ হয়ে গেছে।'

দুর্ঘটনার ঘটনা ও পরবর্তী অবস্থা

১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নৌবাহিনীর স্টাফবাস ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরের দিন জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে বর, বরের বাবাসহ ৯ জনকে মোংলা কবরস্থানে দাফন করা হয়। নববধূ, তাঁর বোন ও দাদিকে দাফন করা হয় খুলনার কয়রার নকশা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে এবং নানিকে দাফন করা হয় দাকোপের চালনায়। আর মাইক্রোবাস চালকের দাফন হয়েছে তাঁর নিজ গ্রাম রামপালে।

এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে বরের ভাই আশরাফুল ইসলাম রামপাল থানায় একটি মামলা করেছেন। এই দুর্ঘটনা মোংলা উপজেলার মানুষের মনে গভীর শোক ও শূন্যতা নিয়ে এসেছে, যা ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।