সড়ক দুর্ঘটনায় দুই মেয়ে, মা ও শাশুড়িকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ আবদুস সালাম মোড়ল
ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে যখন সারা দেশে উৎসবের আমেজ, নতুন পোশাক কেনার ব্যস্ততা আর আনন্দের হিল্লোল, তখন খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিয়ের আনন্দে মাতোয়ারা বাড়িটি আজ শোকের কান্নায় ভেঙে পড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে, জামাতা, বৃদ্ধা মা ও শাশুড়িকে, যা তাঁকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
বিয়ের আনন্দ থেকে শোকের গহ্বরে
গত বুধবার রাতে আবদুস সালামের বড় মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের বিয়ে হয় বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা আহাদুর রহমানের সঙ্গে। বিয়ের পরদিন নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীরা বরের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বিকেলে বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন নবদম্পতিসহ মোট ১৪ জন। এই দুর্ঘটনায় আবদুস সালামের পরিবার হারায় পাঁচ প্রিয়জন, যার মধ্যে রয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে, জামাতা, মা ও শাশুড়ি। ছোট ছেলে ইসমাইল ছাড়া তাঁর আর কোনো সন্তান বেঁচে নেই, যা এই শোককে আরও গভীর করে তুলেছে।
শোকে ভেঙে পড়া পরিবার
বৃহস্পতিবার সকালে আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি শোকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম ভাই। আমার দুই মেয়ে, মা আর শাশুড়ি—সবাই মারা গেছে। আমার তো মা বলে ডাকার মতো আর কেউ নেই।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই ঈদটা হওয়ার কথা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ঈদ। নতুন জামাই-মেয়ে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করব, এই ছিল ইচ্ছা। ভাবছিলাম, বিয়ের পর ওরা বাড়িতে এলে আর যেতে দেব না। একসঙ্গে ঈদ করব। কিন্তু এখন সব শেষ।’
আবদুস সালামের ছোট মেয়ে লামিয়া আক্তারের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ওর (লামিয়া) বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। তবু একটা রোজাও ভাঙেনি। রোজা রেখেই মারা গেল। তিন রোজার দিন আমার সঙ্গে বাজারে গিয়ে একটা জুতা পছন্দ করে কিনেছিল। এখন সেই জুতা আছে, কিন্তু আমার মেয়ে নেই।’ পরিবারের স্বজনেরা জানান, দুর্ঘটনার দিন সকালে সবাই রোজা রেখেই যাত্রা শুরু করেছিলেন, যা এই ট্র্যাজেডিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
ঈদের প্রস্তুতি বনাম শোকের নিস্তব্ধতা
চারদিকে যখন ঈদের আনন্দের প্রস্তুতি চলছে, তখন আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে শুধুই নিস্তব্ধতা ও শোকের ছায়া। সাহ্রির সময়, ইফতারের সময়—প্রতিটি মুহূর্তেই ফিরে আসে প্রিয়জনদের স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘দুই রাত কিছু খাইনি, না খেয়ে রোজা রাখছি। খাইতে গেলে ওদের বড্ড মনে পড়ে। আল্লাহ যেন এমন পরীক্ষা আর কাউকে না দেন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’ তাঁর স্ত্রীও এই শোক সামলাতে পারছেন না, অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং কয়েক দিন ধরে স্যালাইন নিতে হচ্ছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নৌবাহিনী আবদুস সালাম মোড়লকে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে, যেখানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। এর আগে নৌবাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন এবং পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে কোনো আশ্বাসেই যেন সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন না আবদুস সালাম, কারণ যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
এই ঘটনা সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এবং পরিবারের উপর এর মারাত্মক প্রভাবকে উন্মোচিত করে, যা সমাজের জন্য একটি গভীর শিক্ষা হিসেবে কাজ করে।



