ঈদযাত্রায় সদরঘাটে বৃষ্টির ছন্দপতন ও লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত
সকাল থেকেই রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল উৎসবমুখর পরিবেশে ভরে উঠেছিল। দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষা শেষে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা যেন ঘাটের প্রতিটি ইঞ্চিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। একে একে ঘাটে ভিড়ছিল বিশালাকার লঞ্চ—অভিযান-৭, শুভরাজ-৯, পারাবত-১২, সুরভী-১২, কর্ণফুলী-১১ ও ইয়াদ-১১। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি লঞ্চ রঙিন বাতিতে সাজানো হয়েছিল। ডেক থেকে কেবিন—সবখানেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। লঞ্চের সাইরেন আর কুলিদের হাঁকডাকে তৈরি হয়েছিল চিরচেনা উৎসবের আমেজ।
বৃষ্টিতে যাত্রীদের হুড়োহুড়ি ও দুর্ভোগ
তবে হঠাৎ শুরু হওয়া বৃষ্টিতে সেই আনন্দে ছন্দপতন ঘটে। বুধবার (১৮ মার্চ) সকালে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কেউ লঞ্চ ধরতে দৌড়াচ্ছেন, কেউ আবার টার্মিনালের প্ল্যাটফর্মের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। বরিশালগামী পারাবত-১২ লঞ্চের ডেকে বসে থাকা ষাটোর্ধ্ব রহিমা বেগম বলেন, “বাবারে, শহরে মন টেকে না। পোলাপান লইয়া দ্যাশের বাড়ি যামু—এই আনন্দ ভিড়ের কষ্টের চেয়ে বড়।”
লঞ্চের কর্মীরাও ছিলেন ব্যস্ত। শুভরাজ-৯ লঞ্চের লস্কর রফিকুল ইসলাম বলেন, “সবাই যখন বাড়ি যায়, আমরা তখন মাঝনদীতে। আমাদের ঈদ যাত্রীদের সঙ্গেই।” রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাত পৌনে ৮টার দিকে শুরু হওয়া বৃষ্টি প্রায় নয়টা পর্যন্ত চলে। এতে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ছাদে থাকা যাত্রীদের বিপদ ও বিশৃঙ্খলা
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন লঞ্চের ছাদে থাকা যাত্রীরা। কেবিন বা ডেকে জায়গা না পেয়ে যারা খোলা আকাশের নিচে ছিলেন, তারা বৃষ্টিতে ভিজে পড়েন বিপাকে। মালামাল বাঁচাতে ও আশ্রয়ের খোঁজে তাদের ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। পারাবত-১২ লঞ্চের ছাদে থাকা যাত্রী সুলেমান মিয়া বলেন, “কপালটাই খারাপ। কেবিন পাই নাই, তাই ছাদে উঠছিলাম। এখন সব ভিজে গেছে। ছোট বাচ্চা আছে, কোথায় যাব বুঝতেছি না।”
পটুয়াখালীগামী ইয়াদ-১১ লঞ্চের যাত্রী রিফাত বলেন, “নিচে পানি চুইয়ে পড়ছে। ছাদের যাত্রীরা হুড়মুড় করে নিচে নামছে, এতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। ঈদের আনন্দ এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।” বৃষ্টির কারণে লঞ্চ ছাড়তেও দেরি হচ্ছে। এতে যাত্রীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মীরা। সুরভী-১২ লঞ্চের এক কর্মী জানান, ত্রিপল টাঙানোর চেষ্টা করা হলেও ভিড়ের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
বৃষ্টির প্রভাব ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশ
বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, বৃষ্টির কারণে নদীপথে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় লঞ্চ ধীরে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে টার্মিনাল ও লঞ্চের ভেতরে গাদাগাদির কারণে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। এর মধ্যেই বিকালে সদরঘাটে ঘটে মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা। ‘জাকির সম্রাট-৩’ নামের একটি লঞ্চের ধাক্কায় একটি ট্রলারের যাত্রীরা পিষ্ট হন।
লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত
এতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নিহতের সংখ্যা দুইজন। দুর্ঘটনায় এক নারী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে উদ্ধার করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কেরাণীগঞ্জ থেকে আসা একটি ট্রলার থেকে যাত্রীরা লঞ্চে উঠছিলেন। এ সময় পেছন থেকে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর নিখোঁজদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল কাজ শুরু করে।
মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত কমিটি
রাত সোয়া ৯টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। তিনি বলেন, “দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে লঞ্চ দুটির রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, হতাহতরা একই পরিবারের সদস্য এবং তারা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের বাসিন্দা। আহত নারী অন্তঃসত্ত্বা, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরেক দুর্ঘটনায় যাত্রী আহত
এদিকে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভোলাগামী টিপু-১৩ লঞ্চে উঠতে গিয়ে কাওসার নামে এক যাত্রীর পা ভেঙে যায়। ফায়ার সার্ভিস তাকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠায়। এই ঘটনায় ঈদযাত্রার আনন্দ ম্লান হয়ে পড়েছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
