বিয়ের লাল শাড়িতে যাত্রা, সাদা কাপড়ে ফেরা: সড়ক দুর্ঘটনায় নববধূ মিতুসহ ১৪ জনের মৃত্যু
সড়ক দুর্ঘটনায় নববধূ মিতুসহ ১৪ জনের মৃত্যু

বিয়ের আনন্দে বিষাদের ছায়া: সড়ক দুর্ঘটনায় নববধূ মিতুসহ ১৪ জনের মৃত্যু

বিয়ের লাল শাড়ি পরা অবস্থায় শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন মার্জিয়া আক্তার মিতু। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হলো এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের মিতু ফিরলেন সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ হয়ে। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন লামিয়া (১১) ও দাদি রাশিদা বেগম (৭৫)। এই ঘটনায় মোট ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যা পুরো গ্রামকে কান্নায় ভাসিয়ে দিয়েছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকাল ৪টার দিকে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বোলাই ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, বুধবার রাতে কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের ছালাম মোড়লের মেয়ে মিতুর বিয়ে হয় রামপাল এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে। পরদিন সকালে নববধূ মিতু তার ছোট বোন ও দাদিকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।

পথিমধ্যে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি রামপাল বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে মংলা থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই ভয়াবহ সংঘর্ষে মাইক্রোবাসে থাকা নববধূ, বর ও তাদের স্বজনসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও অনেকেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

পরিবারের করুণ দৃশ্য

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টায় মিতুসহ তিনজনের লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছায়। ১৩ মার্চ সকাল ১০টায় উত্তর নাকশা গ্রামেই তাদের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন উপস্থিত হন। জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে মিতুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা ছালাম মোড়ল কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছেন আর বলছেন, ‘আমার মায়েরা কোথায়। আমি একটু তাদের দেখবো।’ তার কান্নায় উপস্থিত সবার চোখে পানি এসে যায়। তিনি তার দুই মেয়ে আর নিজের মায়ের মৃত্যুকে যেন মেনে নিতে পারছেন না।

গ্রামবাসীর শোক ও সমবেদনা

এই ঘটনায় পুরো নাকশা গ্রাম শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। বাড়ির চারি পাশে শুধু কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, মিতু ছিলেন অত্যন্ত মিষ্টি ও সদাহাস্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার বিয়ের আনন্দ মুহূর্তে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজনরা এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করছেন।

এই সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো আবারও উন্মোচিত করেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে পরিবার ও গ্রামবাসীর জন্য এই ক্ষতি পূরণযোগ্য নয়, যা একটি হৃদয়বিদারক স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে।