অগ্নিকাণ্ডের ঋতু: বাংলাদেশে আগুনের সামাজিক ব্যর্থতার গভীর মূল
অগ্নিকাণ্ডের ঋতু: আগুনের সামাজিক ব্যর্থতার গভীর মূল

অগ্নিকাণ্ডের ঋতু: বাংলাদেশে আগুনের সামাজিক ব্যর্থতার গভীর মূল

বাংলাদেশে শীতের শেষভাগ হইতে গ্রীষ্মের পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত একটি অদৃশ্য কিন্তু পরিচিত ঋতু উপস্থিত হয়—উহাকে বলা যায় অগ্নিকাণ্ডের ঋতু। প্রকৃতির ক্যালেন্ডারে এই ঋতুর কোনো নাম নাই; কিন্তু আমাদের নগরজীবনের অভিজ্ঞতায় ইহার উপস্থিতি প্রায় নিয়মতান্ত্রিক। বৃষ্টিহীন শুষ্ক আবহাওয়া, ধুলোমাখা বাতাস, পুরাতন বৈদ্যুতিক সংযোগ, অসতর্ক জীবনাচরণ— এই সমস্ত উপাদান যেন মিলিয়া একটি অদৃশ্য স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় থাকে। গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই এই বাস্তবতার নির্মম প্রমাণ।

সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের নির্মম ঘটনাপ্রবাহ

রাজধানীর মিরপুরে একটি বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লাগিয়া দুই জনের মৃত্যু ঘটিয়াছে। ধোঁয়ার কারণে বহু মানুষ ছাদে আশ্রয় লইতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় উদ্ধার হইয়াছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হইতেছে, বৈদ্যুতিক গোলযোগ হইতেই আগুনের সূত্রপাত। অন্যদিকে ঝিনাইদহে একটি রেস্টুরেন্টে আগুনে লক্ষাধিক টাকার সম্পদ পুড়িয়া গিয়াছে, একই জেলায় তিনটি বাসও আগুনে ধ্বংস হইয়াছে। কিশোরগঞ্জে তুলার গুদামে আগুন লাগিয়া মুহূর্তের মধ্যে পাশের বসতবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। আবার কোথাও বাজারের দোকানপাট, কোথাও পাহাড়ি অঞ্চলের বসতঘর— সকল মিলাইয়া এই ঘটনাগুলি দেখাইতেছে যে, আগুন কেবল একটি দুর্ঘটনা নহে, অনেক সময় ইহা একটি সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক।

অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণসমূহ বিশ্লেষণ

প্রশ্ন হইল, এই ব্যর্থতার মূল কোথায়? প্রথমত, আমাদের স্থাপত্য ও নগর ব্যবস্থাপনার মধ্যে অগ্নিনিরাপত্তা একটি আনুষ্ঠানিক শর্ত মাত্র, বাস্তব ব্যবস্থা নহে। বহু বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকিলেও তাহা কার্যকর অবস্থায় আছে কি না, তাহার নিয়মিত পরীক্ষা হয় না। অগ্নিনির্বাপণ সিঁড়ি বহু ক্ষেত্রে অবরুদ্ধ বা ব্যবহার অযোগ্য। কোথাও জরুরি বহির্গমন পথ তালাবদ্ধ, কোথাও আবার সাইনবোর্ড থাকিলেও মানুষ জানে না—বিপদের সময় কোন পথে বাহির হইতে হইবে।

দ্বিতীয়ত, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার অবহেলা বাংলাদেশের অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণগুলির অন্যতম। পুরাতন বৈদ্যুতিক তার, অতিরিক্ত লোড, অননুমোদিত সংযোগ—এই সকল মিলাইয়া বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্ক অনেক ক্ষেত্রে একটি অদৃশ্য টাইম বোমার ন্যায় কাজ করে। নিয়ম অনুযায়ী বৎসরে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক; কিন্তু কয়টি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের পরীক্ষার সংস্কৃতি চালু রাখে?

তৃতীয়ত, নগরের অগ্নিনির্বাপণ অবকাঠামোও এখনো পর্যাপ্ত নহে। অনেক শিল্পাঞ্চল বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত পানির উৎস নাই। ফলে আগুন লাগিলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রথম সমস্যাই হয় পানি সংগ্রহ করা। অতীতে একাধিক ঘটনায় দেখা গিয়াছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় নিকটবর্তী হাইড্র্যান্ট অচল বা অনুপস্থিত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় অধিক লাগিয়াছে।

চতুর্থত, জনগণের প্রস্তুতিও অত্যন্ত সীমিত। উন্নত বিশ্বে বহু প্রতিষ্ঠান বছরে অন্তত একবার অগ্নিমহড়া পরিচালনা করে। কর্মচারীরা জানে—আগুন লাগিলে কী করিবে, কোথায় যাইবে, কাহাকে সহায়তা করিবে; কিন্তু আমাদের অধিকাংশ অফিস, বিপণিবিতান কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের মহড়ার কথা প্রায় শোনা যায় না।

সমাধানের পথ: মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা

এইখানেই প্রশ্ন জাগে— আমরা কি কেবল অগ্নিকাণ্ডের পর সহানুভূতি জানাইবার সমাজে পরিণত হইয়াছি? প্রতিবার আগুন লাগিলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তার ঘোষণা আসে, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিছুদিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলিতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সকল শান্ত হইয়া যায়; কিন্তু যেই মূল সমস্যাগুলি আগুনের জন্ম দেয়— সেইগুলি অপরিবর্তিতই থাকিয়া যায়।

অতএব প্রয়োজন একটি মৌলিক পরিবর্তন। প্রতিটি বাণিজ্যিক ভবন, কারখানা ও বিপণিবিতানে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা অডিট চালু করা যাইতে পারে। নগর এলাকায় কার্যকর ফায়ার হাইড্র্যান্ট নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং নিয়মিত অগ্নিমহুড়া পরিচালনা করাও জরুরি। তবে ইহার জন্য আইন বা প্রযুক্তি একাই যথেষ্ট নহে। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। কারণ অগ্নিকাণ্ড অনেক সময় একটি ছোট অবহেলা দিয়াই শুরু হয়—কিছু পুরাতন তার, একটি অরক্ষিত গ্যাস সিলিন্ডার, অথবা একটি বন্ধ জরুরি দরজা।

সভ্যতার অগ্রগতি তো কেবল উঁচু ভবন নির্মাণে নহে, বিপদের সময় মানুষকে নিরাপদে বাহির করিবার সক্ষমতায়ও নিহিত। নচেৎ আমাদের শহরগুলি কংক্রিটের অট্টালিকায় পূর্ণ হইলেও, তাহার অন্তরে লুকাইয়া থাকিবে এক অদৃশ্য সত্য—এই সভ্যতা এখনো আগুনের কাছে পরাজিত হইবার জন্য প্রস্তুত।