জামালপুরে নদীভাঙনের দুর্বিষহ জীবন: স্বাস্থ্য-শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হাজারো মানুষ
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে যমুনার পাড় ভাঙছে দ্রুতগতিতে। স্থানীয়রা ট্রলারে করে আনা বালুর বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর শেষ চেষ্টা করছেন, কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই লড়াই যেন নিতান্তই অসহায়ত্বের প্রকাশ। জামালপুরের বেশির ভাগ এলাকা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীসংলগ্ন হওয়ায় প্রতিবছর নদীভাঙন ও বন্যায় ঘরবাড়িসহ সবকিছু হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয় হাজারো মানুষ।
নদীভাঙন ও বন্যার চক্রে আটকে পড়া জনপদ
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীতে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ–নদীবেষ্টিত এলাকার বন্যায় লক্ষাধিক মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় থাকেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরই শুরু হয় ভয়াবহ ভাঙন, যা গ্রাস করে নেয় বসতভিটা ও ফসলি জমি।
ব্রহ্মপুত্র, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঝিনাই, দশানী, জিঞ্জিরাম, আলাই ও মরা জিঞ্জিরাম নদ–নদী প্রবাহিত হয়েছে জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে। এসব নদীর কারণে জেলায় অসংখ্য চর গড়ে উঠেছে, যেগুলো নদীভাঙনের প্রধান শিকার। ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার নদীতীরের ১৫টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামের ফসলি জমি ও ভিটেমাটি কয়েক যুগে বিলীন হয়ে গেছে। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার পরিবার।
জলবায়ু পরিবর্তনে তীব্র হচ্ছে ভাঙন
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার (আইআইইডি) জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা দলের প্রধান ঋতু ভরদ্বজ বলেন, "নদীভাঙনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবহাওয়া এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে—কখনো হঠাৎ অতিবৃষ্টি, কখনো নদীর তীব্র স্রোত, শক্তিশালী জোয়ারের ঢেউ এবং এরপর দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে।" ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতও একই মত পোষণ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে এবং বৃষ্টিপাতের অনুপাত কমবেশি হয়, যা নদীভাঙনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অন্ধকারে জীবন
নদীভাঙনের ফলে একসময়ের জনাকীর্ণ এলাকা এখন শুধুই বালুচরে পরিণত হয়েছে। এসব চরে মৌলিক নাগরিক সুযোগ–সুবিধা থেকে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর, আর স্বাস্থ্যসেবা একপ্রকার দুর্লভ। ইসলামপুর উপজেলার মন্নিয়া চরের বাসিন্দা মো. ইবরাহিম বলেন, "এসব চরে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীর পা পড়ে না। গর্ভবতী নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত।" নিকটতম স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রগুলোও প্রায়ই চরাঞ্চল থেকে বেশ দূরে অবস্থিত, অনেক সময় নদী পার হয়ে উপজেলা শহরের হাসপাতালে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই করুণ চিত্র। গত বছর বন্যার কারণে জামালপুরে ৩৬৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থীর বাড়ি ডুবে যাওয়ায় তারা স্কুলে ফেরা বন্ধ করে দিয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে জানা যায়, চরাঞ্চলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। স্কুলের পরিবর্তে শিশুদের কর্মস্থলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র রয়েছে, বেশির ভাগ শিক্ষক জেলা শহরে থাকেন এবং স্কুলে তেমন একটা আসেন না।
বাস্তুচ্যুত মানুষের করুণ গল্প
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর ডাকাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৬২) একসময়ের সচ্ছল পরিবারের নারী, এখন নিঃস্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "একটা সময় ঘরবাড়ি, জমিজমা, গরু-ছাগলসহ সবই ছিল। সহায়–সম্বল সব গিইল্লা খাইল গাঙ্গে। এই জীবনে ৩০ বার ভিটা ভাঙছে।" সম্প্রতি যমুনা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটিসহ অবশিষ্ট জমিজমাও হারান সাত সন্তানের মা রহিমা বেগম।
মাদারগঞ্জের তেঘরিয়ার কেয়াফুল নামের এক সত্তরোর্ধ্ব নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "এই যে দেখতাছেন নদীডার কিনার, ওইখানে আমার বাড়িডা আছিলো। পুলাপানও দেখে না আমারে, অহন বাড়িডাও গেল নদীতে। কই যামু, কী খামু, এই বয়সে কার কাছে হাত পাতমু জানি না।" এই পরিবারের মতোই অবস্থা পাঁচটি উপজেলার নদী–তীরবর্তী এলাকার হাজারো বাসিন্দাদের।
উন্নয়নের অভাব ও ভবিষ্যৎ
সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) ২০২২ সালে নির্মাণের পর থেকে খালি পড়ে আছে। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৩১ কোটি টাকার বেশি, কিন্তু এলাকার মানুষ এ থেকে কোনো সুবিধাই পায়নি। নদী গবেষক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, "সরকারের মহাপরিকল্পনায় অবহেলিত জেলা নেই। থাকলে এতে জামালপুরের অবশ্যই স্থান পাওয়া উচিত। এখানে বড় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি, শিক্ষার উন্নয়ন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য টেকসই উন্নয়ন দরকার।"
জামালপুরের মানুষ যুগের পর যুগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া সেভাবে লাগে না। নদীভাঙন ও বন্যার এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
