দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি বাড়ছে, বিশেষজ্ঞরা বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেখছেন
বাংলাদেশ তিনটি ভূমিকম্পপ্রবণ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলটি ঐতিহ্যগতভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন সেখানে ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ঘটনা ও জনগণের প্রতিক্রিয়া
গতকাল শুক্রবার দুপুরে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় ৫.৪ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। সাতক্ষীরার বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন, যেখানে অনেকেই শক্ত ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন। আশাশুনি সদরের আবদুল আলীর মতো স্থানীয়রা জানান, হঠাৎ তাদের দোতলা বাড়ি দুলে উঠলে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত নিচে নেমে আসতে বাধ্য হন। এই ঘটনা ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্প বৃদ্ধির কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত দুই প্লেটের মধ্যে বিপরীতমুখী টানের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল প্রভাবিত হচ্ছে, যা এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান উল্লেখ করেন, সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি গত বছরের নরসিংদীতে হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আফটার-শক হতে পারে। এছাড়া, নতুন আবিষ্কৃত কলকাতা-জামালপুর-ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফাটলরেখা থেকে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যতের আশঙ্কা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে, যার মধ্যে বৃহত্তর সিলেট এলাকায় ১০টি সর্বোচ্চ। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর বলেন, ভূ-অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ভূমিকম্প বৃদ্ধি একটি বড় আকারের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতারের মতে, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং তথ্য সংগ্রহের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এখন বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে, যা আগে সম্ভব ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূমিকম্পগুলি ভীতিকর নয়, কিন্তু দেশের ভেতরে এবং আশপাশে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে পারে। হুমায়ুন আখতার আশ্বস্ত করে বলেন, এই অঞ্চলে বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট বাউন্ডারি না থাকায় খুব বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা কম, তবে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। ভূমিকম্প মোকাবিলায় যথাযথ প্রস্তুতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি বাড়ার এই প্রবণতা ভূতাত্ত্বিক সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানাচ্ছে।
