কক্সবাজারে গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতি
কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কে অবস্থিত একটি গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১৬ জন দগ্ধ হয়েছেন এবং ৩০টির মতো গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার উদ্বোধন হওয়া এই পাম্পটি পরের দিন বুধবার রাতে পাইপ লাইন ফুটো হয়ে আগুন ও বিস্ফোরণের শিকার হয়। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই জনবহুল এলাকায় পাম্পটি চালু করা হয়েছিল, যা এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত ও তদন্ত কমিটি গঠন
গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত আশপাশের ঘরবাড়ি, গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিটের টানা পাঁচ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় রাত দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। আহতদের মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এবং ৩ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ জানান, রোগীদের শরীরের ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পুড়েছে এবং সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
জেলা প্রশাসন এই ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পাম্প নির্মাণের বৈধতা যাচাই করবেন। পাম্প মালিক এন আলম দাবি করেছেন, তাঁর কাছে ছাড়পত্র আছে এবং তিনি তদন্ত কমিটির কাছে কাগজপত্র উপস্থাপন করবেন। তবে তিনি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
জনবহুল এলাকায় পাম্প স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই গ্যাস পাম্পটি আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমা হাউজিং ও পুলিশ লাইনস এলাকায় অবস্থিত, যেখানে অন্তত ২০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। পরিবেশ কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জনবহুল এলাকায় এমন পাম্প স্থাপন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা বলেন, পাম্প নির্মাণে পরিবেশ ছাড়পত্র ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেই বলে খবর পাওয়া গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে স্থানীয়রা পাম্প বন্ধ ও সরানোর দাবিতে জড়ো হচ্ছেন। সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সচিব জানান, তদন্তে পাম্পের বৈধতা যাচাই করা হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষয়ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বিস্ফোরণে পাম্পের পাশের গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে রাখা অন্তত ৩০টি গাড়ি পুড়ে গেছে, যার মধ্যে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও পর্যটক বহনের জিপ অন্তর্ভুক্ত। একটি জিপের মালিক শামসুদ্দীন বলেন, তাঁর ৮ লাখ টাকা খরচ করা গাড়িটি আগামী ঈদে চালানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এখন তা পুড়ে ছাই হয়েছে। স্থানীয়রা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প থাকায় ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষত কক্সবাজারে বার্ন ইউনিটের অভাবে আহতদের দূরবর্তী হাসপাতালে পাঠানো হয়, যা জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন, পাম্প নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন না থাকলে পরিবেশ ছাড়পত্রও থাকার কথা নয়। এই ঘটনা জনসুরক্ষা ও নিয়মকানুনের গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলছে।
