কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে ভারী বর্ষণে ১০ মৃত্যু, ১৬ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে বন্যায় ১০ মৃত্যু, ১৬ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে টানা ভারী বর্ষণে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। গত তিন দিনে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ঝড়ো হাওয়ায় অন্তত ১৬০টি দুর্যোগজনিত ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ১০ জন এবং প্রায় ১৬ হাজার শরণার্থী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

দুর্যোগের ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রকাশিত ইন্টার সেক্টর ফ্ল্যাশ সিচুয়েশন আপডেট-২ এ এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ জুলাই রাত ৮টা থেকে ৭ জুলাই সকাল ১০টা পর্যন্ত ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮৩টি ঝড় ও দমকা হাওয়ার ঘটনা, ৫২টি পাহাড়ধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা, তিনটি পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা এবং দুটি অবকাঠামোগত ঝুঁকির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৫ হাজার ৮১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আটজন পাহাড়ধসে এবং দুজন পানিতে ডুবে মারা যান। এছাড়া আহত হয়েছেন ১০ জন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ৩ হাজার ১৮২ জনকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামো ও আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষতি

দুর্যোগে ১ হাজার ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১০টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার মাটি সম্পূর্ণ স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্পসমূহ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্যাম্প-১০, যেখানে ১ হাজার ৮৯১ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরপর রয়েছে ক্যাম্প-৬ (১ হাজার ৩৭৫ জন), ক্যাম্প-১২ (১ হাজার ২৫৫ জন), ক্যাম্প-৫ (১ হাজার ১৪৯ জন), ক্যাম্প-১ ওয়েস্ট (১ হাজার ৩ জন), ক্যাম্প-১১ (৯৮৮ জন), ক্যাম্প-৭ (৭৩৩ জন), ক্যাম্প-১৬ (৬৮৩ জন), ক্যাম্প-১৮ (৬৭৪ জন) এবং ক্যাম্প-১৪ (৬২৫ জন)। আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও ক্যাম্প-১১ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে ২১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্প-১২-এ ১৯১টি, ক্যাম্প-৯-এ ১১৯টি, ক্যাম্প-১৬-এ ৮৮টি, ক্যাম্প-১০-এ ৮৭টি এবং ক্যাম্প-১৮-এ ৮৪টি আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অবকাঠামো ও সেবা খাতে ব্যাপক ক্ষতি

দুর্যোগে ৩৯১টি বিভিন্ন স্থাপনা, ১০৮টি ল্যাট্রিন, ২৪টি পানির উৎস, ২০টি শিক্ষা কেন্দ্র, দুটি মসজিদ, ৪৬৫টি রিটেইনিং ওয়াল, ১০৪টি চলাচলের পথ, ৭৪টি সিঁড়ি, আটটি সড়ক এবং সাতটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বহু ক্যাম্পে নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ এবং জরুরি সেবা গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) খাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ৬০৯টি ল্যাট্রিন, ১৮৮টি গোসলখানা, ৪২টি নলকূপ, ১১টি ট্যাপ স্ট্যান্ড, নয়টি ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, দুটি পানি সংরক্ষণ বাঁধ এবং ১১টি বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রভাব

শিক্ষা খাতে ৬৭৮টি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬৬০টি লার্নিং সেন্টার এবং ১৮টি কমিউনিটি বেইজড লার্নিং ফ্যাসিলিটি। এছাড়া ৪৫টি লার্নিং সেন্টার বর্তমানে ঘরহারা পরিবারের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক শ্রেণিকক্ষ পানিতে তলিয়ে গেছে, কোথাও ছাদ উড়ে গেছে, আবার কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে। শিক্ষা উপকরণও ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে। দুর্যোগের পরপরই ৪৬৭টি পরিবারের ২ হাজার ৩৭৬ জনকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড়ধস, কাদামাটি ও দুর্গম সড়কের কারণে ত্রাণ পৌঁছাতে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে সব স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু থাকলেও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৭টি মোবাইল মেডিকেল টিম, ১৩টি মেডিকেল হাব এবং ৩৩টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ঝুঁকি ও মানবিক চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে। ঘরের মালামাল চুরির আশঙ্কা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানেই থাকছেন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, নারী, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। অনেক এলাকায় সৌরবাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রাতের বেলায় ল্যাট্রিন ও গোসলখানায় যাতায়াতও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

অর্থসংকট ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি

মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থসংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ প্রবেশাধিকার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪০ শতাংশ পাওয়া গেছে। ৩ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলারের চাহিদার বিপরীতে এখনো ২ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে শেল্টার-সিসিসিএম খাতেও প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪২ শতাংশ নিশ্চিত হয়েছে। এ খাতে এখনো ৭ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, অতিরিক্ত অর্থায়ন না হলে পাহাড়ধস প্রতিরোধ, ড্রেনেজ উন্নয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল স্থিতিশীল করা এবং জরুরি মানবিক সেবা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।