মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামা: ইরানের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ও ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপট
ফেরদৌসীর শাহনামা: ইরানের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ও ট্রাম্পের হুমকি

মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামা: ইরানের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ও ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপট

ইরান যুদ্ধের পক্ষগুলো যুদ্ধবিরতি করতে রাজি হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বোমা মেরে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি থেকে আপাতত পিছিয়ে এসেছেন। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে মহাকবি ফেরদৌসীর সমাধিসৌধ ধ্বংস করার পরিকল্পনাও স্থগিত করতে হচ্ছে। ফেরদৌসী ছিলেন ইরানের এক অনন্য কবি, যিনি প্রায় এক হাজার বছর আগে ৫০ হাজার চরণের মহাকাব্য ‘শাহনামা’ রচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে ইরানের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়, যা পারস্য জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রাচীন তুস নগরী ও ফেরদৌসীর সমাধিসৌধ

ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরের কাছে অবস্থিত প্রাচীন নগরী তুসের ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। একসময় সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল এই তুস নগরী, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করত। বর্তমানে সেখানে ধ্বংসস্তূপ, মাটির প্রাচীর ও নিস্তব্ধ প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই প্রাচীন নগরীর এক প্রান্তে সমাহিত আছেন আবুল কাসেম ফেরদৌসী।

ফেরদৌসীর কবরের ওপর নির্মিত স্মৃতিসৌধটি সাদামাটা হলেও এর স্থাপত্য অসাধারণ। বিংশ শতাব্দীতে রেজা শাহের শাসনামলে সৌধটির বর্তমান রূপ তৈরি করা হয়, যখন ইরানে ইসলাম পূর্ব যুগের ঐতিহ্য তুলে ধরার বিশেষ প্রচেষ্টা চলছিল। হালকা রঙের পাথর, স্তম্ভ ও কারুকার্যমণ্ডিত এই স্মৃতিসৌধ প্রাচীন পারস্যের স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা ধ্রুপদি বা ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার প্রতিনিধিত্ব করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফেরদৌসীর জীবন ও শাহনামা রচনা

ফেরদৌসী ৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যখন পারস্য দেশে ইসলাম ধর্ম প্রভাব বিস্তার করছিল এবং আরবি ভাষা পারস্যের নিজস্ব ভাষাকে কোণঠাসা করছিল। শিক্ষিত ব্যক্তিদের মতো ফেরদৌসীও সম্ভবত আরবি শিখেছিলেন, কিন্তু ফারসি ছিল তাঁর মাতৃভাষা। তাঁর শহরে প্রাচীন পারস্যের স্মৃতি তখনো তরতাজা ছিল, যা তাঁকে সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

দশম শতাব্দী নাগাদ আরবি পারস্যের প্রশাসনিক ভাষায় পরিণত হয়, মসজিদ ও বিদ্যালয়ে এর ব্যবহার শুরু হয়, ফলে ফারসি ভাষা লেখালেখি ও উচ্চবিত্তের সংস্কৃতি থেকে পিছিয়ে পড়ে। তবে সাধারণ মানুষ প্রাচীন ফারসি ভাষায় কথা বলতেন এবং ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখলেন। ঠিক এই সময়ে সাহিত্যের দৃশ্যপটে ফেরদৌসীর আগমন ঘটে, যিনি কয়েক দশক কঠোর পরিশ্রম করে ‘শাহনামা’ লিখেছিলেন, যার অর্থ ‘রাজাদের বই’।

মহাকাব্য রচনায় তিনি প্রাচীন নানা উৎস, হারিয়ে যাওয়া কবিতা ও গদ্য এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা গল্পের সাহায্য নিয়েছিলেন। শাহনামাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:

  • প্রথম ভাগ: পারস্য ইতিহাসের পৌরাণিক পর্যায়, যেখানে প্রাচীন রাজা এবং বিশৃঙ্খলা বনাম শৃঙ্খলার লড়াই দেখানো হয়েছে।
  • দ্বিতীয় ভাগ: বীরত্বের যুগের বর্ণনা, যেখানে পারস্য জাতির শ্রেষ্ঠ বীরদের উত্থানের গল্প আছে।
  • তৃতীয় ভাগ: ঐতিহাসিক নানা ঘটনার বিবরণ, যেখানে পরিচিত শাসক ও বাস্তব ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে।

এই অতিকায় মহাকাব্যে মানুষ, পাখি, সাপ ও নানা পশুর দৃশ্য দেখা যায়, যা রাজবংশের উত্থান-পতনের বিশাল ক্যানভাসে গেঁথে আছে।

ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতিতে ফেরদৌসীর অবদান

ফেরদৌসীর কাজকে এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ বলা যায়। অনেকে মনে করেন, তিনি ফারসি ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছেন, যদিও এই দাবি কিছুটা অতিরঞ্জিত হতে পারে, কারণ তখন ফারসি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। তবে তিনি ফারসি ভাষার শক্তিশালী একটি সাহিত্যিক রূপ তৈরি করেছিলেন, যা ভাষাটিকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

ফেরদৌসী খুবই সাদাসিধে ও অভাবের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন এবং শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা আশা করেছিলেন, বিশেষ করে সুলতান মাহমুদ গজনভির কাছ থেকে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তাঁকে প্রতিশ্রুতির তুলনায় নগণ্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, যা পরে বড় অঙ্কের উপহার পাঠানো হলেও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। একটি গল্পে বলা হয়, স্বর্ণালংকার বোঝাই একটি কাফেলা যখন তুস শহরে পৌঁছায়, ঠিক সেই মুহূর্তে ফেরদৌসীর মরদেহ কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, যা সম্ভবত সত্য নয়, কিন্তু তাঁর ভাবমূর্তির সঙ্গে দারুণভাবে মানানসই।

আধুনিক ইরানে ফেরদৌসীর প্রভাব

বর্তমান ইরানে ফেরদৌসী একজন জাতীয় নায়কের মর্যাদা পান এবং তাঁর সাহিত্যকর্মকে ইরানি সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শাহনামার ভাষা প্রাচীন হওয়ায় খুব কম সংখ্যক মানুষের পক্ষে এটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়, এমনকি উচ্চশিক্ষিত ইরানিদের জন্যও তা বোঝা কঠিন। এ কারণে আধুনিক ইরানে মহাকাব্যটি সাধারণত সংক্ষিপ্ত বা আধুনিক সংস্করণে পড়া হয়, তবুও এটি যথেষ্ট প্রভাবশালী এবং এর স্মরণীয় পঙ্‌ক্তিমালা আজও মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়।

ফেরদৌসী নিজে সম্ভবত মুসলিম ছিলেন, কিন্তু তাঁর মহাকাব্যের বড় একটি অংশ প্রাক্‌-ইসলামি যুগের কাহিনি নিয়ে লেখা, যা বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য কিছুটা জটিলতা তৈরি করে। কর্তৃপক্ষ সব সময় এই মহাকাব্যের সেই দিকগুলোকে হালকা করে দেখাতে চেয়েছে, যা চ্যালেঞ্জ হতে পারে, কিন্তু ফেরদৌসী এতটা বড় যে তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।

ফারসি ভাষা ও পারস্য বাগানের ঐতিহ্য

প্যারাডাইস বা স্বর্গ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে, যা ‘পায়রি’ ও ‘দায়েজা’ থেকে উৎপত্তি লাভ করে এবং এর অর্থ ‘ঘেরা জায়গা’। প্রাচীনকালে পারস্যের রাজাদের চমৎকার বাগান ও উদ্যানকে প্যারাডাইস বলা হতো, যেখানে উন্নত সেচব্যবস্থার মাধ্যমে ফলদ বৃক্ষ, ফুলের বাগান ও ছায়াদানকারী গাছ রোপণ করা হতো।

প্রাচীনকালের বাগানের ঐতিহ্য আধুনিক ইরানেও টিকে আছে, ২০১১ সালে ইরানের ৯টি বাগান ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে এবং দেশজুড়ে হাজারো বাগান রয়েছে, যেগুলোর নকশায় জলবাহী নালা দিয়ে চারটি আয়তক্ষেত্রে বিভক্ত করা হয়, যা স্বর্গের চারটি নদীর প্রতীক।

ট্রাম্পের হুমকি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে পারস্য তাদের প্রথম রাজা পেয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৯ বছর আগে, যখন মহান সাইরাস সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ২ হাজার ৩৩৫ বছর আগের ঘটনা। ট্রাম্পের করার মতো কিছু না থাকলে তিনি এই ভেবে স্বস্তি পেতে পারেন যে ইরানে বোমা মারার মতো বাগানের অভাব নেই, কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই বাগানগুলো আবার জেগে উঠবে, অন্যদিকে ট্রাম্প নিজে খুব শিগগির অতীতের বিষয়ে পরিণত হবেন।

বর্তমানে ইরানের প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের মাতৃভাষা ফারসি, বাকিরা এটিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। দেশটির প্রায় সব বাসিন্দা কোনো না কোনোভাবে এই ভাষায় কথা বলতে পারেন, যা ফেরদৌসীর উত্তরাধিকার হিসেবে টিকে আছে।