চীনা এআই কোম্পানির মার্কিন সামরিক গতিবিধি ট্র্যাকিং: নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
চীনা এআই মার্কিন সামরিক গতিবিধি ট্র্যাক করছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি

চীনা এআই কোম্পানির মার্কিন সামরিক গতিবিধি ট্র্যাকিং: নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিমা ও চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু ভাইরাল পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন ঘাঁটির সরঞ্জাম, বিমানবাহী রণতরির অবস্থান এবং তেহরানে হামলার জন্য যুদ্ধবিমান জড়ো করার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্য আসছে চীনের কিছু বেসরকারি কোম্পানি থেকে, যাদের কয়েকটির সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনী বা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) যোগসূত্র রয়েছে।

এআই ও ওপেনসোর্স ডেটার সমন্বয়ে মার্কিন গতিবিধি 'ফাঁস'

এই প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সঙ্গে ওপেনসোর্স ডেটার সমন্বয় ঘটিয়ে এমন বিশ্লেষণ প্রকাশ করছে, যা মার্কিন বাহিনীর গতিবিধি 'ফাঁস' করতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে। চীন ইরান যুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততা থেকে দূরে থাকলেও এসব কোম্পানি বর্তমান সংঘাতকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে। গত পাঁচ বছরে সামরিক কাজে বেসরকারি এআই ব্যবহারের সরকারি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এগুলো আত্মপ্রকাশ করেছে।

রায়ান ফেডাসিউক, আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ফেলো, বলেন, 'চীনে ক্রমে আরও সক্ষম বেসরকারি ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণকারী কোম্পানি বিস্তার লাভ করছে। এসব কোম্পানি দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং সংকটের সময় মার্কিন বাহিনীকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাড়াবে।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মিজারভিশন ও জিঙ্গান টেকনোলজির ভূমিকা

হ্যাংঝৌ শহরভিত্তিক মিজারভিশন নামক প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালে এআইয়ের মাধ্যমে পশ্চিমা ও চীনা তথ্যের সমন্বয় করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির কার্যক্রমের তালিকা তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি ট্র্যাক এবং নির্দিষ্ট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত করছে। তাদের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, '২০২৬ সালে ইরানে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রাক্কালে আমরা দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা অস্ত্র ও সরঞ্জামের অবস্থান শনাক্ত করেছি এবং মার্কিন বিমানবাহী রণতরি গ্রুপগুলোর জ্বালানি সংগ্রহের ধরন 'উন্মোচিত' করেছি।'

অন্য দিকে, হ্যাংঝৌভিত্তিক জিঙ্গান টেকনোলজি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক গতিবিধি ট্র্যাক করছে এবং অপারেশন এপিক ফিউরির শুরুর দিকে দুটি মার্কিন বি-২এ স্টেলথ বোমারু বিমানের কথোপকথন রেকর্ড করার দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, 'এআইয়ের চোখে কোনো কিছুই চূড়ান্তভাবে স্টেলথ বা অদৃশ্য নয়।'

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতভেদ ও উদ্বেগ

চীনা কোম্পানিগুলোর জনসমক্ষে বাজারজাত করা এসব সরঞ্জাম মার্কিন নাগরিকদের জন্য প্রকৃত হুমকি কি না কিংবা মার্কিন শত্রুপক্ষ এগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁরা বলছেন, বেসরকারি খাতের এসব সেবার ব্যাপক ব্যবহার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং বেইজিংয়ের গোয়েন্দা সক্ষমতার শক্তি প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করছে।

ডেনিস ওয়াইল্ডার, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো, মন্তব্য করেন, 'আমার ধারণা, চীনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চাপ অনুভব করছে। তা মোকাবিলা করার উপায় হিসেবে তারা এসব কোম্পানিকে সামনে আনছে এবং বলাচ্ছে—দেখো, আমরা মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন বিমান দেখতে পাচ্ছি।'

বেইজিংয়ের সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় কৌশল

বেইজিং তাদের সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়কৌশলের আওতায় প্রতিরক্ষা খাতে বাস্তবধর্মী ব্যবহারসম্পন্ন এআই তৈরিতে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে। গত মাসে ব্যাপকভিত্তিক পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এসব তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়না এক বিবৃতিতে বলেছে, 'সিসিপির সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো এআইকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রের নজরদারি সরঞ্জামে পরিণত করছে। চীনের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো থেকে আসা এই হুমকি শুধু কাগজে-কলেম সীমাবদ্ধ নয়; বরং আসন্ন।'

তথ্যের উৎস ও সীমাবদ্ধতা

মিজারভিশন ও জিঙ্গান টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্লাইট ট্র্যাকার, স্যাটেলাইট ইমেজ, শিপিং ডেটাসহ ওপেনসোর্স ডেটা ব্যবহার করে বিশ্লেষণ তৈরি করছে। তবে তাদের সরাসরি মার্কিন স্যাটেলাইট উৎসে প্রবেশাধিকার নেই বলে জানা গেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'এই সক্ষমতা এখনো তৈরি না হলেও তাদের উদ্দেশ্যই মূল উদ্বেগের বিষয়।'

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের প্রচলিত গোয়েন্দা তথ্যে কিছু ঘাটতি আছে, তাই এসব কোম্পানির সক্ষমতাকে বাড়িয়ে বলা হতে পারে। তবে এ ধরনের তৎপরতা মার্কিন সামরিক গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।