ইরানে মার্কিন সামরিক গোপন তথ্য বিক্রি করছে চীনা এআই কোম্পানিগুলো
ইরানে যুদ্ধ শুরুর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক পোস্টে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোপন তথ্য ফাঁস হতে শুরু করে। এসব পোস্টে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির সরঞ্জাম, বিমানবাহী রণতরী বহরের চলাচল এবং তেহরানে হামলার প্রস্তুতিতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের মোতায়েন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। এই সংবেদনশীল তথ্যগুলোর পেছনে রয়েছে চীনের দ্রুত বিকাশমান একটি নতুন বাজার, যেখানে বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্মুক্ত তথ্য ব্যবহার করে গোয়েন্দা তথ্য তৈরি ও বিক্রি করছে।
চীনের 'সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন' কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চীনের সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে যুক্ত। যদিও বেইজিং ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে, তবুও গত পাঁচ বছরে সরকারের 'সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন' কৌশলের আওতায় গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বিভক্ত মত পোষণ করছেন—কেউ কেউ মনে করছেন এসব টুল বাস্তব হুমকি হয়ে উঠতে পারে, আবার অন্যরা বলছেন এগুলোর কার্যকারিতা অতিরঞ্জিত। তবে সবাই একমত যে বেসরকারি খাতের এই প্রবণতা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মিজারভিশন ও জিং'আন টেকনোলজির দাবি
হাংঝৌভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মিজারভিশন, যা ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত, পশ্চিমা ও চীনা ডেটা একত্র করে এআই দিয়ে বিশ্লেষণ চালায়। প্রতিষ্ঠানটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির কার্যক্রম, নৌবাহিনীর চলাচল এবং নির্দিষ্ট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত করার দাবি করে। তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বড় ধরনের সমাবেশ শনাক্ত করা হয়েছিল। এছাড়া তারা ইসরাইলের অভদা এয়ার বেস, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস এবং কাতারের আল উইদেদ এয়ার বেস-এ মার্কিন যুদ্ধবিমানের সংখ্যা ও ধরন নিয়েও বিশদ তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা অস্ত্র ও সরঞ্জামের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করেছে এবং মার্কিন রণতরীর জ্বালানি সরবরাহের ধরন পর্যন্ত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, একই ধরনের আরেকটি চীনা প্রতিষ্ঠান জিং'আন টেকনোলজি দাবি করেছে, তারা 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরুর সময় দুইটি মার্কিন বি-২এ স্পিরিট স্টেলথ বোমারু বিমানের মধ্যে যোগাযোগ রেকর্ড করেছে। যদিও পরে তারা সেই রেকর্ড মুছে ফেলে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের অনেকে এই দাবিগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রবেশ করা সম্ভব নয়।
মার্কিন প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ হুমকি
ওয়াশিংটনের আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক রায়ান ফেডাসিউক বলেন, 'চীনে ক্রমবর্ধমান বেসরকারি ভূ-স্থানিক বিশ্লেষণ কোম্পানিগুলো দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে এবং সংকটের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা জোরদার করবে।' ডেনিস ওয়াইল্ডার, যিনি আগে সিআইএ-এর দায়িত্বে ছিলেন, বলেন, 'চীনের গোয়েন্দা ব্যবস্থার ওপর চাপ রয়েছে। তাই এসব কোম্পানি নিজেদের সক্ষমতা অতিরঞ্জিত করে দেখাতে পারে।' তবে মার্কিন আইনপ্রণেতারা বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, চীনের প্রযুক্তি খাত বাণিজ্যিক প্রযুক্তিকে সামরিক নজরদারির অস্ত্রে রূপান্তর করছে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চীনের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করছে—যেখানে সরকার সরাসরি জড়িত না থেকেও এসব তথ্য ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজনে দায় এড়াতে পারে। উল্লেখ্য, ইরান চীনের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী হলেও বেইজিং এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। বরং সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা ইরানকে কিছু গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে।



