মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান-চীনের যৌথ উদ্যোগ: পাঁচ দফা প্রস্তাব ও কূটনৈতিক তৎপরতা
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিতে পাকিস্তান-চীনের যৌথ উদ্যোগ

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান-চীনের যৌথ উদ্যোগ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসন ও স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি যৌথ প্রস্তাব প্রকাশ করেছে পাকিস্তান ও চীন। মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দেশটির শান্তি প্রচেষ্টায় চীনের সমর্থন চান। এই বৈঠকের পরই দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচ দফার একটি প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়।

বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু ও যৌথ বিবৃতি

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ইসহাক দারের এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানে চলমান সংঘাত নিরসনে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন করে প্রচেষ্টা চালানো। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিসহ সব নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।

বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সংঘাত নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ হলো সংলাপ ও কূটনীতি। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মূল পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত বা উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীনের ভূমিকা ও কৌশলগত অবস্থান

ইরানের জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে চীনের তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ থেকে তারা সচেতনভাবেই নিজেদের দূরে রেখেছে। শুরুতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানালেও পরবর্তীতে মূলত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে বেইজিং।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীন বর্তমানে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ শান্তি উদ্যোগ চীনের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক ভূমিকা

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান যুদ্ধের অবসান এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকরে পাকিস্তান নিজেকে মূল কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। শান্তি আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে ইসলামাবাদকে বেছে নেওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির একযোগে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাঁরা একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বিশ্বের আরও বহু নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এমনকি যুদ্ধরত এই দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা সরাসরি ভূমিকা রাখছেন।

আঞ্চলিক সম্মেলন ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

গত রোববার ইসলামাবাদে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের একটি আঞ্চলিক সমাধান খোঁজার লক্ষ্যেই এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় এই আলোচনার কূটনৈতিক গুরুত্ব ও প্রভাব কিছুটা কমেছে।

পাকিস্তানি কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকার বলেছেন, মুসলিম বিশ্বে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে চায় পাকিস্তান। একই সঙ্গে তারা বহির্বিশ্বের অংশীদারদের, বিশেষ করে ওয়াশিংটন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নিজেদের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের জানান দিতে তৎপর।

পাকিস্তানের স্বার্থ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি

এই সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের নিজস্ব বিশাল স্বার্থ জড়িত বলে বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন:

  • হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহে অবরোধের কারণে ইতিমধ্যেই দেশটিকে চড়া অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে
  • পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থল সীমান্ত রয়েছে, ফলে সংঘাত অশান্ত বেলুচিস্তান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
  • ইরানের পর পাকিস্তান বিশ্বের বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল, ফলে দীর্ঘায়িত সংঘাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা
  • সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানের অনিচ্ছাকৃত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি

রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাকার আরও উল্লেখ করেন, ইরানে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে পাকিস্তানের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এই সংঘাত বাড়লে তা ইসলামাবাদকে চরম এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকারভাবে আলোচনা এগোচ্ছে। তবে ইরান বারবারই বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অনিশ্চয়তা নির্দেশ করে।

পাকিস্তান ও চীনের এই যৌথ শান্তি উদ্যোগ আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এর সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সহযোগিতা ও ইচ্ছার ওপর। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলারও একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।