ইরানকে সমর্থনের চেয়ে জ্বালানি ও কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন
ইরান সমর্থনের চেয়ে জ্বালানি-কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন

ইরানকে সমর্থনের চেয়ে জ্বালানি ও কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় চীন তীব্র নিন্দা জানালেও, বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না চীন।

জ্বালানি সংকট ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ

এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, এই জলপথ এখন তাদের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ এবং তারা পারস্য উপসাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।

চীনসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশ জ্বালানি তেল আমদানির জন্য এই সরু জলপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে, চীনের বিশাল কৌশলগত তেল মজুত স্বল্পমেয়াদী সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ও ট্রাম্প-শি বৈঠক

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আগামী ৩১ মার্চ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান থেকে চীনে তেল আমদানিতে বড় বাধা তৈরি না করে, তবে এই সংকটে ট্রাম্প-শি বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘বেইজিং ইরানকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে, সামরিক মিত্র হিসেবে নয়। উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কও চীনকে সরাসরি সামরিক সহায়তা থেকে বিরত রাখছে।’

চীনের মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ভূমিকা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে বেইজিং ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে মধ্যস্থতা করেছিল। পরবর্তীতে, ইরানকে চীন ও রাশিয়া নেতৃত্বাধীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) পূর্ণ সদস্য করা হয়।

চীনের বিশাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই অঞ্চলের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে। ‘কেপলার’-এর তথ্য মতে, চীনের নিজস্ব উৎপাদিত তেল দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ পূরণ হয়। ২০২৫ সালে, চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের ৫৭ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে, যার মধ্যে ইরান থেকে দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি হয়েছে।

বিশাল তেল মজুত ও নিরাপত্তা কৌশল

জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও চীন যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে। কেপলার-এর বিশ্লেষক মুয়ু সু লিখেছেন, চীনের কাছে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে, যা সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের প্রায় ১১৫ দিনের চাহিদার সমান।

মুয়ু সু বলেন, ‘এই বিশাল মজুত চীনকে একটি বড় সুরক্ষা দেবে। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও বা তেলের দাম বাড়লেও চীন ও তাদের রিফাইনারিগুলো সহজেই তা সামলে নিতে পারবে।’

চীনের সীমিত প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ইরানের নেতা নিহত হওয়ায় চীন ‘তীব্র বিরোধিতা ও কড়া নিন্দা’ জানালেও, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং শুধু সামরিক অভিযান বন্ধ ও সংঘাত বিস্তার রোধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, এই সংঘাতে একজন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর প্রতিবেদনে গ্যারেথ লেদার ও মার্ক উইলিয়ামস লিখেছেন, চীনের প্রায় অর্ধেক তেল আমদানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়, তাই এই অঞ্চলে জ্বালানি প্রবাহ সচল রাখা তাদের প্রধান স্বার্থ। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

কেপলার-এর বিশ্লেষক সু মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলে রাশিয়া এর সুফল ভোগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে, ভারত ও চীনের জন্য রুশ তেল মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে।