ইরানের বাস্তবতা: নারী, রাজনীতি ও সংস্কৃতির অপ্রকাশিত দিক
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ধারণা, ইরানে নারীরা ঘরে বন্দী কিংবা পর্দার অন্তরালে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রবেশ করলেই দেখা যায়, অফিস, আদালত, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র নারীরা সক্রিয় ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। এমনকি রাস্তায় ট্যাক্সি চালাতেও দেখা যায় নারীদের।
পড়াশোনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ ছয় বছর ইরানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ২০১৩ সালে পিএইচডি প্রোগ্রামে যান, যখন ১ ডলার সমান ছিল ২৯০০ তুমান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এটি ১ লাখ ৪০ হাজার তুমানে পৌঁছেছে, যা অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইরানের সামাজিক নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা নির্বিঘ্নে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া যেত। মুমিত আল রশিদ একজন বিদেশি হয়েও তেহরান থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের কেরমান প্রদেশে একা ভ্রমণ করেছেন।
হাসান রুহানির মধ্যপন্থী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ছয় জাতি পরমাণু চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, যা জনগণকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুহানি দ্বিতীয়বার জয়ী হওয়ার পরও ইরানের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রাহবার ইমাম খামেনি ও তাঁর ১২ জন উপদেষ্টার প্রভাব রয়েছে।
বর্তমান সংকট ও আঞ্চলিক সম্পর্ক
ইব্রাহিম রাইসি ২০২১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর মাসা আমিনী হত্যাকাণ্ড, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ডলারের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে, বিশেষত সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননে ইরানের প্রভাব নিয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ভূমিকা
ইরানের সাহিত্য ও ফারসি ভাষা উদার, আধ্যাত্মিক ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক। বর্তমান কবি-সাহিত্যিকরা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, যদিও অনেককে জেল-জরিমানার শিকার হতে হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনচেতা এবং ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
ইরান কখনোই নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়নি, খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটিয়েছে পারস্য সভ্যতার আদলে। তরুণরা মেধার বিকাশ ঘটিয়েছে স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে, দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থেকে।
