৯ বছর পর আবারও ইসরাইল সফরে মোদি, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের কূটনৈতিক কৌশল
৯ বছর পর আবারও ইসরাইল সফরে মোদি

৯ বছর পর আবারও ইসরাইল সফরে মোদি, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের কূটনৈতিক কৌশল

আগামী বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে ইসরাইল যাচ্ছেন। এটি হবে দীর্ঘ ৯ বছর পর তার দ্বিতীয় ইসরাইল সফর, যেখানে ২০১৭ সালে তার প্রথম সফরটি ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইতিহাসিক ইসরাইল যাত্রা। মোদির এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ভারতসহ বিশ্বের শতাধিক দেশ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের বিবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠলেও, ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের প্রতি নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক সমর্থন আগের তুলনায় কিছুটা স্তিমিত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। তবে ভারত ও ইসরাইলের এই বর্তমান ঘনিষ্ঠতা সব সময় এমন ছিল না।

১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারত দৃঢ়ভাবে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৩৮ সালে গান্ধী লিখেছিলেন, "ফিলিস্তিন আরবদের জন্য ঠিক তেমনি, যেমন ইংল্যান্ড ইংরেজদের জন্য।" ১৯৪৭ সালে ভারত জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিভাজন পরিকল্পনার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল এবং ১৯৪৯ সালে ইসরাইলের জাতিসংঘ সদস্যপদ লাভেরও বিরোধিতা করেছিল।

১৯৫০ সালে ভারত ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আরব দেশগুলোর অনুভূতি ও ফিলিস্তিনি স্বার্থের কথা গভীরভাবে বিবেচনা করে পরবর্তী চার দশক ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন ফিলিস্তিনিদের দিকে থাকলেও নেপথ্যে ইসরাইলের সাথে একটি গোপন সামরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ইসরাইল ভারতকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছিল।

কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

১৯৭৪ সালে ভারত প্রথম অনারব দেশ হিসেবে পিএলও-কে ফিলিস্তিনি জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ইয়াসির আরাফাতের সাথে ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। তবে ১৯৯২ সালে পিভি নরসিং রাও সরকারের আমলে ভারত প্রথমবারের মতো ইসরাইলের সাথে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় ইসরাইলের লেজার-গাইডেড বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ভারতের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্কের সকল লুকোছাপা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ভারত এশিয়ায় ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের অন্যতম প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এমনকি গাজা যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের অভাব পূরণে হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিককেও বর্তমানে ইসরাইলে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা

বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকার বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমাগত গভীর করা হচ্ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান' বা টু-স্টেট সলিউশনের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন অব্যাহত রাখা হয়েছে। যদিও ভারত জাতিসংঘে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু প্রস্তাবে ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে, কিন্তু পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারিত্বের সমালোচনায় এখনো সোচ্চার রয়েছে।

মোদির এই সফর আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার সূক্ষ্ম কূটনৈতিক কৌশলেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। এটি ভারতের বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যেখানে ঐতিহাসিক মিত্রতা ও বর্তমান কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে।