টিপু সুলতানকে 'খলনায়ক' বানানোর চেষ্টায় বিজেপি: ইতিহাসের রাজনৈতিক অপব্যবহার
নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার ইতিহাসকে কখনো পথপ্রদর্শক হিসেবে না দেখে বরং একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ইসলামি বিষয় সামনে এলে বিজেপি তা বেছে বেছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। মহারাষ্ট্র রাজ্যে অতীতে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাম ব্যবহার করে মেরুকরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, এবার নতুন লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে মহীশূরের ১৮ শতকের শাসক টিপু সুলতানকে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলটি একই কৌশলে তাকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ও প্রতিক্রিয়া
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওয়ের ডেপুটি মেয়র শান-এ-হিন্দ নিহাল আহমেদ তার কার্যালয়ে টিপু সুলতানের ছবি টাঙানোর সিদ্ধান্ত নিলে বিজেপি এবং মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দুই দলই ছবি সরিয়ে ফেলার দাবি তোলে এবং ডেপুটি মেয়রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। একই দিনে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি হর্ষবর্ধন সপকাল টিপু সুলতানকে রাজা শিবাজীর সঙ্গে তুলনা করে তাকে 'মহান নেতা' হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, টিপু সুলতান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন এবং তিনি ভারতের অকৃত্রিম সন্তান ছিলেন।
সহিংসতা ও আইনি পদক্ষেপ
কংগ্রেস নেতা সপকালের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ এই তুলনাকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে ঘোষণা করেন। তার বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনেতে বিজেপির কর্মীরা কংগ্রেস দলের কার্যালয়ের সামনে সহিংস আন্দোলন শুরু করে, যেখানে পাথর ছোড়াছুড়ি হয় এবং অন্তত ৯ জন আহত হন। পুনে পুলিশের যুগ্ম কমিশনার রঞ্জন কুমার শর্মা জানান, আহতদের মধ্যে তিনজন কংগ্রেস কর্মী, দুজন বিজেপি কর্মী, দুজন নারী কনস্টেবল এবং দুজন সাংবাদিক রয়েছেন। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছে।
বিজেপি নেতার অভিযোগের ভিত্তিতে পুনে পুলিশ সপকালের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ধারা ১৯২, ১৯৬, ৩৫২ এবং ৩৫৬-এ মামলা করেছে, যার মধ্যে দাঙ্গা বাধানো, বিভেদ সৃষ্টি, শান্তি ভঙ্গ এবং মানহানির অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে ১৭ ফেব্রুয়ারি সপকাল তার তুলনার জন্য ক্ষমা চান এবং দাবি করেন যে তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অতীতের দ্বিমুখী নীতি ও রাজনৈতিক সমালোচনা
কংগ্রেস এবং উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা বিজেপির দ্বিমুখী নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কংগ্রেস দাবি করে যে ২০১৩ সালে বিজেপি করপোরেটররাই মুম্বাইয়ের একটি রাস্তার নাম 'শহীদ টিপু সুলতান মার্গ' রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা তখনকার বিএমসি স্থায়ী কমিটি অনুমোদন করেছিল। শিবসেনা দলীয় সংসদ সদস্য সঞ্জয় রাউত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের টিপু সুলতানের প্রশংসামূলক বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন।
শিবসেনার মুখপত্র 'সামনা' সম্পাদকীয়তে বিজেপির সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে দলটি শিবাজী-টিপু বিতর্ককে হিন্দু-মুসলিম রং দেওয়ার চেষ্টা করছে। সম্পাদকীয়তে আরও দাবি করা হয়, পাকিস্তানে টিপু সুলতানকে বীর হিসেবে গণ্য করা হলেও বিজেপি ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনকে নিন্দনীয় মনে করে না। এই ঘটনাটি ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইতিহাসের অপব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
