হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) টহল অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় প্রণালিটি আংশিক খুলে দেওয়া হয়েছে। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা প্রথমবার ইরানের বন্দর আব্বাসে গিয়ে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন ও স্থানীয়দের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব দেখেছেন।
যুদ্ধের প্রভাব ও যুদ্ধবিরতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করে। বিশ্বের শক্তিশালী দুটি দেশের বিরুদ্ধে অসম এই যুদ্ধে ইরান নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত করে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই আইআরজিসি তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর গুলি ছোড়া শুরু করে। এতে কার্যত গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথটি অচল হয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাবিকেরা হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়েন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও জ্বালানিভিত্তিক পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত নানা পণ্যের দাম বাড়তে থাকে।
তেহরানের পদক্ষেপের জবাবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের উপসাগরীয় বন্দরগুলো ব্যবহারকারী যেকোনো জাহাজ লক্ষ্য করে তারা এ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপে কয়েক মাস ধরে পারস্য উপসাগরে মাছ ধরা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অনেক জেলেই মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধ করে দেন। আবার কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে বের হন। এই জেলেরা ভালো করে জানেন, একটি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
যুদ্ধবিরতি ও বর্তমান পরিস্থিতি
তবে এখন পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইরান কয়েক সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেওয়ার পর উত্তেজনা কমেছে। জেলেরাও ধীরে ধীরে মাছ ধরায় ফিরছেন। মাছ ধরায় ফেরা এসব জেলের একজন আবদুল রহমান। বন্দর আব্বাস ও এর আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রায় যুদ্ধ কী প্রভাব ফেলেছে, তা কাছ থেকে দেখাতে তিনি বিবিসি প্রতিনিধিকে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ঘুরে দেখান। প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে দুটি কনটেইনারবাহী জাহাজ। গত এপ্রিলে সংঘাতের চরম পর্যায়ে আইআরজিসি জাহাজ দুটি জব্দ করেছিল। সেই সময় আইআরজিসির দাবি ছিল, অনুমতি ছাড়া চলাচল ও নৌ-নির্দেশনা ব্যবস্থায় কারসাজি করার মাধ্যমে জাহাজ দুটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছিল। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পানামার পতাকাবাহী এমএসসি ফ্রান্সেসকা ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এপামিনোনডাস নামের জাহাজ দুটি এখনো ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
ইরান উপকূলের অদূরে দেখা গেল নোঙর করা আরও কয়েক ডজন জাহাজ। হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের জন্য এগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষায় আছে। বন্দর আব্বাস উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ‘হরমুজ’ দ্বীপের দিকে এগোতেই আমাদের গাইড আবদুল রহমান সমুদ্রমুখী একটি পুরোনো দুর্গ দেখালেন। দুর্গের জীর্ণ লাল দেয়ালগুলো মনে করিয়ে দেয়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লড়াই চলছে। ১৬ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত এ দুর্গটি হরমুজে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের আধিপত্য বজায় রাখার মূল কেন্দ্র ছিল। ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস প্রথম পর্তুগিজদের এখান থেকে বিতাড়িত করেন। শাহ আব্বাসের নামানুসারেই বন্দর আব্বাস শহরের নামকরণ হয়েছে।
কৌশলগত গুরুত্ব ও হুমকি
কৌশলগত দিক থেকে বন্দর আব্বাস এখনো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের কাছাকাছি ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত শহরটিতে দেশটির নৌবাহিনী এবং আইআরজিসির নৌ শাখার প্রধান ঘাঁটি রয়েছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে শহরটি যেমন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি শক্তিশালী শত্রুদের মোকাবিলায় ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশলের প্রধান চাবিকাঠি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এ সংঘাত আরও তীব্র করার হুমকি দিয়ে আসছেন। ইরান এ প্রণালি খুলে না দিলে ‘তাদের কোনো দেশ থাকবে না’ বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইরান কয়েক সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেওয়ায় উত্তেজনা কমেছে। জেলেরাও ধীরে ধীরে মাছ ধরতে ফিরছেন। তবে ট্রাম্পের এ হুমকি এবং যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইরান এখনো এ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য চলমান আলোচনায় তেহরানের কাছে এটি এখনো একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার।
যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন ও স্থানীয়দের জীবন
বিবিসির প্রতিনিধিদল যখন বন্দর আব্বাসে পৌঁছায়, তখন সেখানে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। পরিবারগুলো নিজ নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন, দোকানপাট আবার খুলেছে এবং রাস্তায় আবারও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে বাজারটিতে সমুদ্রপথে পণ্য আসার পর তা দক্ষিণ ইরানে ছড়িয়ে পড়ত, সেটি আবার ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে। তবে এই স্বাভাবিকতার মধ্যেও যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। বন্দর আব্বাসের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক পেছনেই খুশনুদি সড়ক। সেখানকার একটি বহুতল আবাসিক ভবন এখন এক ধ্বংসস্তূপ। গত ২৬ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবনটির অর্ধেক অংশ কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাকি অর্ধেক চূর্ণ-বিচূর্ণ কংক্রিট আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া রডের স্তূপে পরিণত হয়েছে। যেসব ঘরে একসময় সপরিবার মানুষ বসবাস করত, সেগুলো বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই ক্ষতবিক্ষত দেয়ালের ওপর উড়ছে ইরানের জাতীয় পতাকা।
ভবনটিতে কিছু বাণিজ্যিক কার্যালয়ও ছিল। ৪০ বছর বয়সী নারী উদ্যোক্তা ফাতিমা তেমনই একটি কার্যালয়ের মালিক। হামলার সময় তিনি অন্য জায়গায় ছিলেন। ফাতিমা বলেন, ‘এখানে যে পরিবারগুলো থাকত, তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার চেনাজানা ছিল। সেখানে মা ও শিশুরাও ছিল। হামলার সময় তারা সবাই ঘুমাচ্ছিল। কেউ কেউ বেঁচে গেলেও তিনজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের একজন ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে এখানে থাকতেন। তবে এটি কোনো সামরিক ঘাঁটি ছিল না।’ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, এ হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার আলী রেজা তাংসিরি। হামলার চার দিন পর ইরান তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনটি ধসে পড়লে তিনজন নিহত এবং সাতজন আহত হন। রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর আব্বাস যে প্রদেশের রাজধানী, সেই হরমুজগানে বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২৬১ জন নিহত হয়েছেন।
স্থানীয়দের মতামত ও ভবিষ্যৎ
এদিকে স্থানীয় বাজারে বিবিসির প্রতিনিধিদল সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অনেকে মুখ খুলতে রাজি হননি। এর কারণ স্পষ্ট না করলেও কেউ কেউ বলেন, গণমাধ্যমে ইরানকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তার ওপর তাঁদের কোনো ভরসা নেই। অবশেষে এক তরুণী কথা বলতে রাজি হন। তিনি সম্প্রতি চীন থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের এ কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকতেই দেশে ফিরে এসেছেন। ওই তরুণী বলেন, ‘ইরানের মানুষ এখন একে অপরকে সাহায্য করার জন্য এক জোট হয়েছে।’
বাজারের আঁকাবাঁকা গলির আরও ভেতরের দিকে ৫৫ বছর বয়সী ফাতেমা নামের এক নারী বসে পিচ ফল বিক্রি করছিলেন। বাজারের এ অংশগুলো একেকটি সুনির্দিষ্ট পণ্যের জন্য আলাদা করা। একপাশে উপসাগর থেকে ওই দিন সকালে ধরে আনা তাজা মাছ, অন্যপাশে দক্ষিণ ইরানের খেজুর, আমদানিকৃত ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, সুগন্ধি, গৃহস্থালি পণ্য ও ঐতিহ্যবাহী বান্দারি পোশাক বিক্রি হচ্ছে। ফাতেমা জানান, যুদ্ধের কারণে তাঁর ছেলে চাকরি হারিয়েছেন। এখন তাঁর এ ফলের দোকানের আয়ের ওপর পুরো পরিবারকে নির্ভর করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাইনি। যখন বোমা হামলা হতো, আতঙ্কে কাটাতাম। ট্রাম্প যুদ্ধ চেয়েছিলেন। তিনি আকস্মিকভাবে আমাদের ওপর হামলা করেছেন। আমরা এমনটা কখনো চাইনি।’ কাছেই দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলেন ৪০ বছর বয়সী মাসুমেহ। তিনি আলোচনায় যোগ দিয়ে বলেন, ‘প্রতিটি যুদ্ধই সমস্যা তৈরি করে। এটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের এখন ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে এখন আলোচনা চলছে। পরীক্ষা করা হচ্ছে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে। এটি স্পষ্ট যে এ আলোচনাতেও হরমুজ প্রণালিই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। তবে এ জনপদে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের হিসাবটা একেবারেই ভিন্ন। তাঁদের কাছে যুদ্ধ মানে কর্মসংস্থান হারানো, বিমান হামলার আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটানো। স্বাভাবিকভাবেই চলতি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যেন কার্যকর ও স্থায়ী হয়—সেই আশায় বুক বাঁধছেন তাঁরা।



