হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণার পরও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রোববার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালি ‘খুলে দেওয়ার’ ঘোষণাও দেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ওই পোস্টের শেষে ট্রাম্প লেখেন, ‘বিশ্বের সব জাহাজ, ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ শুরু হোক!’ তবে বিবিসি ভেরিফাই জাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মেরিনট্রাফিকের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। তাতে দেখা গেছে, চুক্তির ঘোষণার পর এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ পার হয়েছে। অথচ উপসাগরীয় এলাকায় ৫৮০টির মতো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এর পর থেকেই তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ সাধারণত এ পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত শুরুর আগের মতো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পথে বড় কিছু বাধা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিরাপত্তা, মাইন ও টোল।
আটকে পড়া জাহাজের সংখ্যা
মঙ্গলবার মেরিনট্রাফিকের তথ্যে দেখা যায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে ২৫০টির বেশি তেলবাহী ট্যাংকার ও ৩৩০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্যমতে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ট্যাংকারই স্থির দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে দেখা যায়, এসব জাহাজের অনেকগুলোই সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনালের কাছে জড়ো হয়েছে। ওই এলাকায় মোট জাহাজের সংখ্যা বাস্তবে আরও বেশি হবে। কারণ, অনেক জাহাজ নিজেদের অবস্থান সম্প্রচার করছে না। ফলে সেগুলো মেরিনট্রাফিকের তথ্য আসছে না।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি তেল বিশ্লেষক নবীন দাস বলেন, ‘প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হলে প্রথমেই আমরা উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে একযোগে বেরিয়ে যেতে দেখব।’
নিরাপত্তা ও সুরক্ষা
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপের মার্টিন কেলি বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নিতে একজন ক্যাপ্টেনকে ভীষণ সাহসী হতে হবে। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে। এর পর থেকে দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালিটি পার হওয়ার চেষ্টা করলেই তারা গুলি ছুড়েছে।
এদিকে গত ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোয় নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, এর পর থেকে তারা নির্দেশ অমান্যকারী নয়টি জাহাজকে অচল করে দিয়েছে। এমনকি এর মধ্যে কয়েকটি জাহাজের ইঞ্জিন রুমে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার মার্কিন নৌ অবরোধ ‘তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের’ ঘোষণা দেন। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত এ অবরোধ বহাল থাকবে। ১৫ জুন ধারণ করা কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে ওমান উপসাগরের প্রবেশমুখে মার্কিন অবরোধ রেখার কাছাকাছি চারটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির ঘোষণার পর জাহাজের ক্যাপ্টেন, মালিক ও বিমা কর্তৃপক্ষ জাহাজকে আরব সাগরের দিকে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা উপসাগরীয় এলাকায় নিজেদের জাহাজের অবস্থান ঠিক করে নিচ্ছে। তবে কেউই প্রথম জাহাজটি নিয়ে বের হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কেপলারের বিশ্লেষক নবীন দাস বলেন, ‘আমরা এখনো সবার মধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি। কেউই আসলে প্রথমে ঝুঁকিটা নিতে চাইছেন না।’
নবীন দাস আরও বলেন, ‘কিছু মালিক ও ক্যাপ্টেন ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন। যেমন গ্রিসের কিছু কোম্পানি। আমরা হয়তো তাদের জাহাজ নিয়ে সফলভাবে প্রবেশ করতে এবং বেরিয়ে যেতে দেখব। এটি অন্যদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে।’
সাগরে জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিশেল উইস বকম্যান বলেন, গত এপ্রিলের শুরুর দিকের ঘটনাগুলো অনেক ক্যাপ্টেনই মনে করবেন। সে সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণালিটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর ঠিক এক দিন পরই ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এই প্রণালি বন্ধ। তখন মাঝপথে থাকা ৩৩টির বেশি জাহাজ ঘুরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এমনকি বেশ কয়েকটি জাহাজে গুলি ছোড়ারও খবর পাওয়া যায়।
মার্টিন কেলি বলেন, ‘পুরো চিত্রটা আসলে কেমন দাঁড়ায়, তা দেখতে আমাদের আরও দু-এক দিন, সম্ভবত শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
মাইনের হুমকি
যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইরান একটি হুমকি দিয়েছিল। ইরানের আধা সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, দেশটি বলেছিল, তাদের উপকূল বা দ্বীপগুলোয় হামলা হলে তারা উপসাগরে ‘বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাইন’ স্থাপন করবে। এর মধ্যে উপকূল থেকে ছাড়া যায়, এমন ভাসমান মাইনও থাকবে। এর পর থেকেই সাগরে সন্দেহজনক ‘ভাসমান’ বস্তুর বিষয়ে সতর্কতা জারি করে আসছে বহুজাতিক জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার এবং ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি সিনেট কমিটিকে জানান, ইরান ‘হরমুজ প্রণালির বিশাল অংশে মাইন পুঁতে রেখেছে’।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিনগুয়েজ বিবিসিকে বলেন, জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফেরাতে হলে এসব মাইন অপসারণ করাই হবে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণালিটি মাইনমুক্ত করার কাজ বেশ ধীরগতির হবে। এতে ৩০ দিন থেকে শুরু করে ছয় মাস পর্যন্ত লাগতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইনডিপেনডেন্ট ট্যাংকার ওনার্সের ফিলিপ বেলচার বলেন, ‘আমরা আসলে কিছুই জানি না। এই ধোঁয়াশা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমানঘেঁষা দক্ষিণের পথটিতে মাইন নেই বলেই মনে হচ্ছে। তাই মাইন অপসারণকারী দলগুলোর মূল মনোযোগ থাকবে প্রণালির মাঝখান দিয়ে যাওয়া প্রধান পথটির দিকে।
মার্টিন কেলি বলেন, তাদের (মাইন অপসারণকারী দল) সত্যিই খুব ধীরগতিতে এগোতে হবে। সম্ভবত দুই বা তিন নট বেগে, যাতে তারা পানির নিচের পরিস্থিতি ভালোভাবে জরিপ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন জাহাজ একই সঙ্গে প্রণালির ভেতর দিয়ে যাওয়া-আসা করতে পারবে—এমন পরিস্থিতি তৈরির জন্য মাইন অপসারণকারীদের একটি বেশ প্রশস্ত চ্যানেল বা পথ পরিষ্কার করতে হবে।
হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য মাইন অপসারণ অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে নৌযান পাঠিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার মঙ্গলবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ হরমুজ প্রণালি আবার চালুর ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ‘পুরোপুরি অংশগ্রহণ’ করবে। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর সহায়তাকারী জাহাজ ‘আরএফএ লাইম বে’ মাইন সন্ধানের সরঞ্জামে সজ্জিত। গতকাল সাইপ্রাসের আরএএফ আক্রোতিরি বিমানঘাঁটির কাছে জাহাজ ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় এটিকে দেখা গেছে।
টোল বা ফি
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি প্রাকৃতিক জলপথ। ঐতিহাসিকভাবেই এই পথ দিয়ে বিনা খরচে অবাধে জাহাজ চলাচল করে আসছে। সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের জলসীমায় জাহাজের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ দিতে বাধ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই এই সনদে স্বাক্ষর করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচলের সুযোগটি প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনেরই অংশ। অবশ্য পানামা ও সুয়েজ খালের মতো মানুষের তৈরি কিছু জলপথে নির্দিষ্ট সেবার জন্য টোল বা ফি নেওয়া হয়।
এবার যুদ্ধ চলার সময় ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এর অংশ হিসেবে তারা ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ বা পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ গঠন করে। ইরান বলেছিল, এই কর্তৃপক্ষ জাহাজ চলাচলে ‘নিরাপদ পারাপারের অনুমতিপত্র’ ইস্যু করবে। তবে প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইরানের এসব চেষ্টা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রোববার যখন ইরানের সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দেন সে সময় তিনি বলেন, প্রণালিটি ‘টোল ফ্রি’ বা বিনা মাশুলে খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরানের বার্তা সংস্থা ফারসের প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালিটি ইরানই পরিচালনা করবে। জলপথটি পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলোর ওপর সম্ভাব্য ‘সার্ভিস ফি’ও বসানো হতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের সেবার জন্য এই ফি নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে নবীন দাস বলেন, প্রণালিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের নতুন ফি পদ্ধতি ‘কাজে আরেক দফা বাধা সৃষ্টি করবে’। এটি প্রতিদিন কতগুলো জাহাজ পার হতে পারবে, তার ওপর একধরনের ‘লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করতে পারে।
আগামী শুক্রবার চুক্তিতে সই হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা আলোচনা চলাকালে হয়তো এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত শুরুর আগে যেভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলত, তেহরান এখন সেভাবে চলাচলের সুযোগ দেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। নবীন দাস আরও বলেন, ‘কে এটি কার্যকর করবে, কীভাবে এটি কার্যকর হবে, কীভাবে ফি আদায় করা হবে, অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোই–বা বিষয়টি কীভাবে দেখবে?’
কেপলারের দিমিত্রিস অ্যাম্পাৎজিদিস বলেন, মূল বিষয় হলো রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রণালিটি হয়তো খুব দ্রুতই খুলে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।



