দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা বা তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) বাংলাদেশের পাশে থাকার চূড়ান্ত ইঙ্গিত দিয়েছে চীন। বেইজিং জানিয়েছে, বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা কোনও তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত। তবে তিস্তা নদীটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর এবং সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকার মাত্র ১০-২০ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ায় বেইজিংয়ের এই সম্পৃক্ততা দিল্লির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও যৌথ ইশতেহার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে চীন বেছে নেওয়ার পর সেখানে প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে ঘোষণা করা হয় যে, চীন তিস্তা প্রকল্পে নিজস্ব সক্ষমতার মধ্যে বাংলাদেশ ও দেশের বিশেষজ্ঞদের সমর্থন ও সহায়তা প্রদান করবে। এছাড়া, এই প্রকল্পে যুক্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়না সরাসরি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে এবং দেশটির সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) স্ট্র্যাটেজিক কাজের সাথে যুক্ত।
রংপুরে বাড়ছে চীনা প্রভাব
তিস্তা সংলগ্ন রংপুর বিভাগে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক খাতে চীনাদের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ছে। এর মধ্যে সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২ (এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর ৪-লেন মহাসড়ক), গাইবান্ধায় তিস্তা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সৈয়দপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প অন্যতম। সম্প্রতি নীলফামারীর উত্তরা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলেও চীনা রাষ্ট্রদূত সফর করেছেন। এর পাশাপাশি লালমনিরহাটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন একটি বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করতে চীনকে আমন্ত্রণ জানানোয় সীমান্ত এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও তিস্তার অমীমাংসিত ইতিহাস
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন একটি দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপাক্ষিক সমস্যা, যার মধ্যে তিস্তা চুক্তি ২০১০ সাল থেকে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে চুক্তি সইয়ের কাছাকাছি পৌঁছালেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে তা ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা তিস্তা খনন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আসলেও ততদিনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। শেখ হাসিনা সরকার ভারতের কথা মাথায় রেখে বেইজিংকে এই প্রকল্পে অতিরিক্ত জড়াতে না দিলেও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনকে আমন্ত্রণ জানায়। বর্তমান পানি সম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, চলতি অর্থবছরই তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও গঙ্গা চুক্তি
২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। বিএনপি ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে, ভারতের সাথে সম্পর্ক এই চুক্তির ওপর ‘নির্ভর’ করবে। অনেকের ধারণা, তিস্তা সংকটকে সামনে এনে বাংলাদেশ মূলত গঙ্গা চুক্তিতে নিজেদের অনুকূলে সুবিধা নেওয়ার কৌশল নিতে পারে।
পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক প্রবেশ
একই সঙ্গে, এই অঞ্চলে পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক প্রবেশও স্পষ্ট হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে একটি পাকিস্তানি বাণিজ্য প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছে। এছাড়া রাওয়ালপিন্ডি থেকে একটি ‘যৌথ সামরিক কমান্ড’ গঠনের প্রস্তাব এবং জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি ফাইটার বিমান সরবরাহের প্রস্তাব এসেছে, যার সিমুলেটর দুই মাস আগে সরবরাহ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর এটিই প্রথম কোনও পাকিস্তানি সামরিক সরঞ্জামের বাংলাদেশে প্রবেশ, যা চীনের চেংডু এয়ারক্রাফটের সাথে যৌথভাবে তৈরি।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করতে হলে ভারতের রাজ্য স্তরে ‘বাংলাদেশি’ পুশব্যাক নীতির মতো নেতিবাচক অবস্থান থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গঙ্গায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো সংকট নিরসনে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে যৌথ অংশীদারিত্ব তৈরি করা জরুরি। একই সাথে বেইজিংয়ের নীতির বিপরীতে দিল্লির ঐতিহ্যগত উদার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তিস্তা প্রকল্পের জন্য একটি আকর্ষণীয় প্যাকেজ প্রস্তাব করা উচিত, যা উপযুক্ত সময়ে ভারতের এই উদারতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়ের সাবেক পরিচালক তারা কার্থারের কলাম থেকে নেওয়া।



