যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে আসন্ন বৈঠকে ইরান, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), পারমাণবিক অস্ত্র ও বাণিজ্য ইস্যুতে বিস্তৃত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্মকর্তারা। খবর রয়টার্স।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির নেতারা ছয় মাসের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠকে বসছেন। বাণিজ্য উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
ট্রাম্প বুধবার (১৩ মে) বেইজিং পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই নেতার মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৭ সালের পর এটি হবে ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ফোরাম
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করতে নতুন কিছু ফোরাম গঠনে সম্মত হতে পারে। পাশাপাশি চীন বোয়িং উড়োজাহাজ, মার্কিন কৃষিপণ্য ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ক্রয়চুক্তি ঘোষণা করতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে ‘বোর্ড অব ট্রেড’ ও ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ গঠনের পরিকল্পনাও বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হতে পারে। তবে এসব কাঠামো কার্যকর করতে পরে আরও আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতিও আলোচনায় আসবে। বর্তমানে কার্যকর থাকা ওই সমঝোতার ফলে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। যদিও চলতি সপ্তাহেই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘চুক্তিটির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। উপযুক্ত সময়ে সম্ভাব্য বর্ধিত মেয়াদ নিয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে বলে আমি আশাবাদী।’ ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তাইওয়ান, ইরান ও পারমাণবিক ইস্যুতে উত্তেজনা
ট্রাম্প-শি বৈঠকে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়গুলোও উঠে আসবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান, তাইওয়ান ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ। চীন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং দেশটি এখনো ইরানি তেলের বড় ক্রেতা। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর শুরু হওয়া সংঘাত বন্ধ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটাতে চীনের প্রতি চাপ বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়েও বেইজিংয়ের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান ও রাশিয়া প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে চীনের মাধ্যমে ওই দেশগুলোর আয়, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং সম্ভাব্য অস্ত্র রপ্তানির বিষয়।’
অন্যদিকে তাইওয়ান প্রশ্নে ওয়াশিংটনের ওপর অসন্তুষ্ট শি জিনপিং। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে চীন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক ও অস্ত্র সরবরাহকারী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের আশপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে চীন। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না।
এআই ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়েও আলোচনা
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন। দুই দেশের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যোগাযোগের একটি স্থায়ী চ্যানেল তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হবে। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি কীভাবে হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে দুই নেতার বৈঠককে আমরা একটি সুযোগ হিসেবে দেখছি, যাতে এআই বিষয়ে যোগাযোগের একটি কাঠামো গড়ে তোলা যায়।’
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা শুরু করতেও দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বেইজিং এখন পর্যন্ত নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে আলোচনা করতে অনাগ্রহী। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে, তারা আপাতত কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা বা সে ধরনের উদ্যোগে বসতে আগ্রহী নয়।
বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপট
সর্বশেষ গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়েছিল। সে সময় দুই দেশ তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধে সাময়িক বিরতিতে সম্মত হয়। ওই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শতকরা তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপ করেছিল এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় চীন বিশ্ববাজারে বিরল খনিজ সরবরাহ সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, বিশ্বজুড়ে আমদানি পণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা অনেক শুল্কের আইনি বৈধতা ছিল না। তবে ট্রাম্প অন্য আইনি পথ ব্যবহার করে নতুন করে কিছু শুল্ক আরোপের অঙ্গীকার করেছেন।



