পশ্চিমবঙ্গে ভোটের পর সহিংসতা: মানবিক সংকটের কথা
পশ্চিমবঙ্গে ভোটোত্তর সহিংসতা: মানবিক সংকটের কথা

৪ মে, দীর্ঘ ভ্রমণের দিন। ঢাকা থেকে দোহা। কাতারের দোহা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক। তারপর সড়কপথে পেনসলভেনিয়া রাজ্যের ফিলাডেলফিয়া। একজন বাবা হিসেবে আমার ভেতরে তখন অন্যরকম আনন্দ কাজ করছিল। বহুদিন পর ছেলে আর বউমার কাছে যাচ্ছি। সঙ্গে আমার স্ত্রী লতিফা নিলুফার পাপড়িও রয়েছেন। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো ক্লান্তিকেও হার মানায়। বিমানবন্দরের অপেক্ষা, ইমিগ্রেশনের লাইন, লম্বা যাত্রা— সবকিছু তখন সহনীয় মনে হয়।

কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই ঢুকে পড়লো আরেকটি খবর। দোহার ট্রানজিট লাউঞ্জে বসে জানতে পারলাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল। চারপাশে অনেক ভারতীয় যাত্রী ছিলেন। কেউ মোবাইলে লাইভ দেখছেন, কেউ ফেসবুক স্ক্রল করছেন, কেউ ফোনে কথা বলছেন, কেউ আনন্দে উৎফুল্ল, কেউ হতাশ, কেউ চুপচাপ— গণতন্ত্রের এটাই স্বাভাবিক দৃশ্য। নির্বাচনে কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কারও মুখে হাসি থাকবে, কারও চোখে কষ্ট।

কিন্তু এরপর যা দেখলাম, তা আমাকে গভীরভাবে আহত করেছে। সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক সহিংসতার ভিডিও ভেসে আসতে লাগলো। কোথাও উত্তেজিত স্লোগান, কোথাও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক কথা, কোথাও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ, কোথাও আতঙ্কে মানুষ ঘর ছাড়ছে, কোথাও প্রতিশোধের ভাষা, কোথাও মানুষ মানুষকে শুধু ধর্মের পরিচয়ে বিচার করছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমি জানি, সামাজিক মাধ্যমে সব ভিডিও সত্য নাও হতে পারে। অনেক কিছু বাড়িয়ে বলা হয়। অনেক কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট— নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশে অস্বস্তি, উত্তেজনা এবং ভয়ের ছাপ তৈরি হয়েছে। আর সেটিই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গ তো আমাদের খুব কাছের। সীমান্ত আলাদা হতে পারে, ভাষা আলাদা নয়। ওপারের মানুষও বাংলা বলে। তাদের হাসি-কান্না, সংস্কৃতি, গান, স্মৃতি— সবই আমাদের পরিচিত। তাই পশ্চিমবঙ্গে আগুন লাগলে তার ধোঁয়া এপার বাংলার মনেও এসে লাগে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন

এবারের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাস গড়ে সরকার গঠনের অবস্থানে পৌঁছেছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন। অপরদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ভবানীপুর আসনে পরাজিত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। গণতন্ত্রে এ ধরনের পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে মানুষের প্রত্যাশা বদলে যায়। ভোটাররা নতুন কাউকে সুযোগ দিতে চান। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তখনই নষ্ট হয়ে যায়, যখন ভোটের ফলাফল মানুষের বিবেককে ছোট করে দেয়। যখন রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের মানবিক পরিচয়কে মুছে ফেলে। যখন প্রতিবেশী প্রতিবেশীর শত্রু হয়ে যায়। আমি সবসময় ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। হিন্দু উগ্রবাদ যেমন বিপজ্জনক, মুসলিম উগ্রবাদও তেমন বিপজ্জনক। সংখ্যাগরিষ্ঠের উগ্রতা যেমন ক্ষতিকর, সংখ্যালঘুর উগ্রতাও তেমন ক্ষতিকর। কারণ উগ্রবাদ কখনও মানুষের কল্যাণ আনে না। উগ্রবাদ শুধু ঘৃণা জন্ম দেয়। মানুষকে বিভক্ত করে। সমাজকে অমানবিক করে তোলে।

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশে যখন সাম্প্রদায়িক হামলা হয়, তখন আমরাও ব্যথিত হই। মন্দিরে হামলা হলে, হিন্দু পরিবার আক্রান্ত হলে, একজন মানবিক মানুষ হিসেবে কষ্ট পাই। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। ঠিক তেমনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যদি মুসলমানরা ভয় পায়, যদি তারা নিজেদের অনিরাপদ মনে করে, সেটিও উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভয়ের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কারও মঙ্গল আনে না। আজ মুসলমান ভয় পাবে। কাল অন্য কেউ ভয় পাবে। শেষ পর্যন্ত ভয়ই রাষ্ট্রকে গ্রাস করবে। আমরা কি সেই পৃথিবী চাই?

আমার মনে হয়, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট এখন অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়— মানবিক সংকট। মানুষ ক্রমে অন্য মানুষের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। আগে মানুষ প্রতিবেশীর ধর্ম জিজ্ঞেস করার আগে খোঁজ নিতো, কী হয়েছে? আর এখন আগে জিজ্ঞেস করে, ও কোন পক্ষের, কোন ধর্মের? কাকে ভোট দিয়েছে? এই পরিবর্তন খুব ভয়ংকর। কারণ সভ্যতা টিকে থাকে সহানুভূতির ওপর। রাষ্ট্র টিকে থাকে ন্যায়বিচারের ওপর। আর সমাজ টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর।

রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ধর্মীয় পরিচয়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতময়। বাম আমল, তৃণমূল আমল; সব সময়ই রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ ছিল। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। এখন বিজেপির উত্থানের পর নতুন এক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনীতি আরও তীব্র হয়েছে। এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই উদ্বেগের বিষয়। কারণ আমরা সবাই ধীরে ধীরে এমন এক সমাজের দিকে যাচ্ছি, যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, ভোটব্যাংক হিসেবে দেখা হয়।

এখন রাজনীতিবিদেরা জানেন, মানুষকে উন্নয়নের ভাষায় যতটা না এক করা যায়, ধর্মের ভাষায় তার চেয়ে সহজে উত্তেজিত করা যায়। তাই ঘৃণার বাজার সবসময় গরম থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সত্যিই এই ঘৃণা চায়? আমি বিশ্বাস করি না। সাধারণ মানুষ শান্তি চায়। একজন হিন্দু বাবা যেমন তার সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চান, একজন মুসলিম বাবাও তাই চান। একজন মা সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান— তার ধর্ম যাই হোক না কেন। তাহলে এত ঘৃণা আসে কোথা থেকে। ঘৃণা আসে সংগঠিত প্রচারণা থেকে, ঘৃণা আসে রাজনৈতিক লাভের হিসাব থেকে, ঘৃণা আসে অশিক্ষা থেকে, আর আসে সামাজিক নীরবতা থেকে। আমরা যখন অন্যায় দেখে চুপ থাকি, তখন অন্যায় আরও সাহসী হয়ে ওঠে। আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে বেশি নাগরিক সমাজের ভূমিকা। লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, মানবাধিকারকর্মী; সবাইকে সামনে আসতে হবে। ধর্মীয় নেতাদেরও দায়িত্ব আছে। মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত— সবাইকে শান্তির কথা বলতে হবে। কারণ ধর্মের আসল শিক্ষা ঘৃণা নয়। ধর্ম মানুষকে হত্যা করতে শেখায় না। ধর্ম মানুষকে অপমান করতে শেখায় না। যে ধর্ম মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখায় না, সেটি ধর্মের অপব্যবহার।

আমাদের করণীয়

আমাদের মনে রাখতে হবে, নির্বাচন পাঁচ বছরে একবার আসে। কিন্তু প্রতিবেশী প্রতিদিন পাশে থাকে। ক্ষমতা বদলায়, সরকার বদলায়। পতাকা বদলায়, কিন্তু মানুষের সম্পর্ক ভেঙে গেলে তা সহজে জোড়া লাগে না। আমি আমেরিকায় এসে দেখছি, নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বাস করছে। এখানে সমস্যা নেই, তা নয়। বৈষম্য নেই, তা-ও নয়। কিন্তু আইন এবং সামাজিক চর্চা মানুষকে অন্তত এই শিক্ষা দেয়— তোমার মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তোমার নিরাপত্তার অধিকার সমান। আমাদের উপমহাদেশেও সেই চর্চা দরকার।

বাংলাদেশে হিন্দুর নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ভারতে মুসলমানের নিরাপত্তাও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিখ, একজন খ্রিষ্টান, একজন বৌদ্ধ— সবাই সমান মর্যাদা পাবেন, এটাই তো আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা। আজ যদি আমরা সংখ্যালঘুর কান্না না শুনি, কাল সংখ্যাগরিষ্ঠও নিরাপদ থাকবে না। কারণ সহিংসতা কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। এটি ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে বিষিয়ে তোলে।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বহু আন্দোলনের ইতিহাস বহন করে। এই বাংলাই রবীন্দ্রনাথের বাংলা, এই বাংলাই নজরুলের বাংলা, এই বাংলাই লালনের মানবতার বাংলা। সেই বাংলায় মানুষ যদি ধর্মের কারণে একে অপরকে ঘৃণা করে, তবে সেটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, সাংস্কৃতিক ব্যর্থতাও। আমি এখনও বিশ্বাস করি, সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা ঘৃণা চান না। এখনও অসংখ্য তরুণ আছেন, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান। এখনও অসংখ্য সাধারণ মানুষ আছেন, যারা শুধু শান্তিতে বাঁচতে চান। তাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হতে হবে। কারণ নীরব মানবতা কখনও কখনও সংগঠিত ঘৃণার কাছে হেরে যায়।

আমরা যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ সমাজ দিতে চাই, তবে এখনই ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। ধর্মকে নয়, মানুষকে ভালোবাসতে শিখতে হবে। ভোটকে নয়, বিবেককে বড় করতে হবে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবে। কিন্তু আমি বলবো পশ্চিমবঙ্গে মানুষের পরাজয় যেন না হয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক