ইইউর কৃষি ভর্তুকি থেকে কোটি কোটি ইউরো নিচ্ছে আমিরাতের রাজপরিবার
ইইউর কৃষি ভর্তুকি থেকে কোটি কোটি ইউরো নিচ্ছে আমিরাতের রাজপরিবার

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কৃষি ভর্তুকি কর্মসূচি থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ক্ষমতাসীন আল নাহিয়ান রাজপরিবার কোটি কোটি ইউরো সুবিধা পাচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ও ‘ডিসমগ’-এর এক যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

কীভাবে সুবিধা নিচ্ছে রাজপরিবার?

অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ডিসমগ, স্পেনের এল দিয়ারিও এবং রোমানিয়ার জি৪ মিডিয়া যৌথভাবে পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে, আল নাহিয়ান পরিবারের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রোমানিয়া, ইতালি ও স্পেনে থাকা কৃষিজমির জন্য সাত কোটি ১০ লাখ ইউরোর বেশি ভর্তুকি পেয়েছে।

আল নাহিয়ান পরিবার বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাজপরিবার হিসেবে বিবেচিত। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩২০ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশ এসেছে আমিরাতের বিশাল তেলসম্পদ থেকে। পরিবারটি আমিরাতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজপরিবার, যার নেতৃত্বে আছেন আবুধাবির শাসক ও ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইইউর কৃষি ভর্তুকি কর্মসূচি

ইইউর কমন অ্যাগ্রিকালচারাল পলিসি (ক্যাপ) কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ইউরো কৃষি ও গ্রামীণ খাতে ব্যয় করা হয়। এটি পুরো ইইউ বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এই অর্থের একটি অংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের হাতেও যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে দেখা যায়, আল নাহিয়ান পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১১০টি ইউরোপীয় ভর্তুকি পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী রোমানিয়ার কৃষি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাগ্রিকস্ট’। প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় খামারের মালিক, যার আয়তন প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর। এটি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শহরের চেয়েও প্রায় পাঁচগুণ বড়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভর্তুকির অসম বণ্টন

ইইউর কৃষি ভর্তুকি বড় ভূমিমালিকদের অসমভাবে বেশি সুবিধা দেয়। ২০২৪ সালে গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মাত্র ১৭ জন বিলিয়নিয়ার তিন বিলিয়ন ইউরোর বেশি পেয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই অ্যাগ্রিকস্ট সরাসরি এক কোটি পাঁচ লাখ ইউরো পেয়েছে—যা গড় ইইউ খামারের তুলনায় এক হাজার ৬০০ গুণ বেশি।

মানবাধিকারকর্মীরা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। দেশটিতে রাজনৈতিক কর্মীদের কারাবন্দি করা, সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং নির্যাতনের বহু অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে ইউএই সরকার।

খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিরাতের এ সম্প্রসারণ মূলত তাদের খাদ্য নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির সংকটের কারণে দেশটিতে চাষাবাদ বেশ কঠিন। বর্তমানে আমিরাতকে তাদের খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়।

২০১৮ সালে আল দাহরা নামের একটি আমিরাতভিত্তিক কৃষি কোম্পানির মাধ্যমে ‘অ্যাগ্রিকস্ট’ কিনে নেয় আল নাহিয়ান পরিবার। পরে আবুধাবির সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এডিকিউ কোম্পানিটির ৫০ শতাংশ মালিকানা নেয়। একইভাবে স্পেনেও আল দাহরা আট হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমির মালিক হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব খামার পাঁচ মিলিয়ন ইউরোর বেশি ক্যাপ ভর্তুকি পেয়েছে।

ইইউর সংস্কার পরিকল্পনা

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ইউরোপীয় ভর্তুকির বড় অংশ জমির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। ফলে বড় জমির মালিকরাই বেশি সুবিধা পান। এ কারণে ইইউ এখন ভর্তুকির সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে। ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সালের নতুন প্রস্তাবে প্রতি কৃষকের জন্য বছরে এক লাখ ইউরোর বেশি ভর্তুকি সীমিত করার কথা বলা হয়েছে।

আল নাহিয়ান পরিবার এবং এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত কোম্পানিগুলো মন্তব্যের জন্য পাঠানো একাধিক অনুরোধের জবাব দেয়নি। ইউরোপীয় পরিবেশ ব্যুরোর কর্মকর্তা ফস্টিন বাস-ডিফোসেজ বলেন, এই নীতিমালা প্রকৃত কৃষকদের সহায়তা না করে ধনী ভূমিমালিকদের আরও ধনী করছে। এমনকি এখন তা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাকেও অর্থ জোগাচ্ছে।

ইউএইর রাষ্ট্রীয় তহবিল ও রাজপরিবারের সম্পদের মধ্যে স্পষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের আড়ালে রাজপরিবারও সরাসরি সুবিধা ভোগ করছে।