ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের সমালোচনায় ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের হুমকি
ইরান যুদ্ধে ইউরোপের সমালোচনায় ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহার হুমকি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের সমালোচনায় ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের হুমকি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা এবং ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল নিয়ে অসন্তোষের জেরে বড় ধরনের পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ৪৮ ঘণ্টায় ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি জার্মানি, ইতালি ও স্পেন থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। ইতোমধ্যে জার্মানি থেকে আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে পেন্টাগন।

উত্তেজনার সূত্রপাত

চলমান ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও কৌশল নিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সাম্প্রতিক বক্তব্যের জের ধরেই মূলত এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মের্ৎস বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপমানিত’ হচ্ছে এবং এই সংঘাত নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কোনও ‘যৌক্তিক কৌশল’ নেই। জার্মানির মার্সবার্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ আমাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং আমাদের অর্থনৈতিক উৎপাদনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প তার ট্রুথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মের্ৎসকে নিয়ে কটাক্ষ করে লিখেছেন, ইরান নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং নিজ দেশের সমস্যার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এরপরই ট্রাম্প জার্মানি থেকে সেনা সংখ্যা কমানোর বিষয়টি পর্যালোচনার ঘোষণা দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতালি ও স্পেনের প্রতিও হুমকি

পরে ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সরানোর ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেন, কেন আমি সেটা করব না? ইতালি আমাদের কোনও সাহায্য করেনি এবং স্পেনের ভূমিকা ছিল ভয়াবহ, একেবারেই ভয়ংকর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইউরোপে মার্কিন সেনার বর্তমান চিত্র

পেন্টাগনের ডিফেন্স ম্যানপাওয়ার ডাটা সেন্টারের (ডিএমডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপে প্রায় ৬৮ হাজার ৬৪ জন সক্রিয় মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। এর মধ্যে জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে মোট ৫৩ হাজার সেনা রয়েছে।

ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করছে মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ড বা ইউএসইউসিওএম। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই কমান্ড সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ইউএসইউসিওএম-এর অধীনে মোট ছয়টি সার্ভিস কম্পোনেন্ট কমান্ড রয়েছে। এই বাহিনীগুলো হলো- সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, মেরিন কোর, স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস এবং তুলনামূলকভাবে নতুন গঠিত স্পেস ফোর্স।

কোন দেশে কত মার্কিন সেনা?

  • জার্মানি: ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি রামস্টেইন এয়ার বেস জার্মানিতে অবস্থিত। ১৯৫২ সাল থেকে দেশটিতে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বর্তমানে জার্মানির পাঁচটি গ্যারিসনে মোট ৩৬ হাজার ৪৩৬ জন সক্রিয় মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন।
  • যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যের তিনটি ঘাঁটিতে মোট ১০ হাজার ১৫৬ জন মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এদের অধিকাংশই বিমান বাহিনীর সদস্য।
  • ইতালি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই ইতালিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। দেশটিতে ভিসেনজা, আভিয়ানো, নেপলস এবং সিসিলির ঘাঁটিগুলোতে ১২ হাজার ৬৬২ জন সক্রিয় মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তারা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশনে কর্মরত।
  • স্পেন: জিব্রাল্টার প্রণালির কাছে মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে ৩ হাজার ৮১৪ জন সেনা স্থায়ীভাবে নিযুক্ত রয়েছেন।
  • পোল্যান্ড: ডিএমডিসি ও কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ডের চারটি ঘাঁটিতে ৩৬৯ জন স্থায়ী সেনার পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার ঘূর্ণায়মান সেনা মোতায়েন রয়েছে। এই ঘূর্ণায়মান বাহিনী ‘ইউরোপীয় ডিটারেন্স ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে।
  • রোমানিয়া: রোমানিয়াতে ১৫৩ জন স্থায়ী মার্কিন সেনার পাশাপাশি ঘূর্ণায়মান মার্কিন বাহিনী অবস্থান করছে। দেশটির মিহাইল কোগালনিসিয়ানু এয়ার বেস, ক্যাম্প তুরজি এবং দেভেসেলে ঘাঁটিগুলোতে মার্কিন বাহিনীর প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
  • হাঙ্গেরি: হাঙ্গেরির কেচকেমেট এবং পাপা এয়ার বেসে ৭৭ জন স্থায়ী মার্কিন সেনা রয়েছেন। এছাড়া দেশটিতে ঘূর্ণায়মান মোতায়েন ও নিয়মিত সামরিক মহড়া পরিচালনা করে মার্কিন বাহিনী।

কংগ্রেসের বাধা ও আইনি জটিলতা

প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষা বিভাগ সাধারণত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এ বিষয়ে বড় ধরনের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে আইনি ও তহবিল সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে হতে পারে। এর আগেও ২০২০ সালে ট্রাম্প জার্মানি থেকে সেনা সরানোর হুমকি দিয়েছিলেন, তবে তৎকালীন কংগ্রেসের হস্তক্ষেপে এবং পরবর্তীতে জো বাইডেনের সিদ্ধান্তে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়।

চলতি বছর পাস হওয়া ২০২৬ সালের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (এনডিএএ) অনুযায়ী, ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা স্থায়ীভাবে ৭৫ হাজারের নিচে কমানোর সুযোগ নেই।

কেন এই ঘাঁটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। যদিও সময়ের সাথে সাথে এর উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়েছে, তবে এই ঘাঁটিগুলো মার্কিন সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, আফগানিস্তান ও বর্তমানের ইরান যুদ্ধে মার্কিন অভিযানের জন্য এই ঘাঁটিগুলো বড় ধরনের লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করে। এছাড়া জার্মানির ল্যান্ডস্টুল রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টার যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের বৃহত্তম হাসপাতাল, যা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র।

কেন ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা সরাতে চান ট্রাম্প?

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন না পাওয়াই এই সেনা প্রত্যাহারের হুমকির মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ওয়াশিংটনকে লড়াইয়ে সহায়তা করছেন না এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতেও কোনও ভূমিকা রাখছেন না। যুদ্ধ শুরুর পর স্টারমার মার্কিন বাহিনীকে ইরানবিরোধী হামলায় যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর প্রেক্ষিতে ট্রাম্প তাকে ‘উইনস্টন চার্চিল নন’ বলে বিদ্রূপ করেন।

অন্যদিকে, এক সময়ের ট্রাম্পের প্রিয় ইউরোপীয় নেতা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করায় ট্রাম্প তার ওপর চড়াও হয়েছেন। ইরান যুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলোর এই নেতিবাচক অবস্থান ট্রাম্পকে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

সূত্র: আল জাজিরা, এপি