মাসখানেক আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমেনি। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা অবরোধ দিয়ে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কৌশল। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মতো ‘মোয়িং দ্য গ্রাস’ কৌশল গ্রহণ করতে পারে। এই সামরিক শব্দটির অর্থ হলো বাড়ার আগেই কেটে ফেলা, অর্থাৎ সীমিত আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল রাখা। ইসরাইল হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে এই কৌশল ব্যবহার করে থাকে।
কৌশলের সম্ভাব্য প্রভাব
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষক মাইকেল কার বলেন, এই কৌশল নিলে ইরান পাল্টা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতে হামলা চালাতে পারে এবং মার্কিন জাহাজেও ড্রোন হামলা করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কারণে এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও যুদ্ধবিরতি
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে ‘খারাপ কোনো চুক্তিতে তাড়াহুড়া করবে না’। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টারা ইরানের নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট’ বা স্থবির সংঘাতে পরিণত হতে পারে, যেখানে হরমুজ প্রণালি চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
অর্থনৈতিক ও সামরিক খরচ
মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের হিসাবে, যুদ্ধের প্রথম মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৩ সালের ইরাকের মতো বড় আকারের স্থল অভিযান চালাতে মাসে ৫৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লাগতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বহন করতে পারবে না। ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ জারি করেছে এবং অঞ্চলে বড় সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপ করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি
নরওয়ের পিস রিচার্স ইনস্টিটিউট অসলোর গবেষক চ্যান্ডলার উইলিয়ামস বলেন, এই সংঘাত পরিকল্পনার চেয়ে দীর্ঘায়িত হয়েছে। যদি এটি আরও বাড়ে বা ‘দীর্ঘস্থায়ী’ সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে তা আরও জটিল হবে। কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ মেহরান কামরাভা বলেন, ‘না-যুদ্ধ, না-চুক্তি’ পরিস্থিতি উভয় পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল। ইরান দীর্ঘদিন বন্দর অবরুদ্ধ রাখতে পারবে না, আর যুক্তরাষ্ট্রও অনির্দিষ্টকাল অবরোধ বজায় রাখতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি প্রয়োজনে হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। ইরান হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হয়। এতে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।



