মধ্য এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস: চীনের সেনলিং কাউন্টি ও আফগান সংযোগ
মধ্য এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস: চীনের সেনলিং কাউন্টি

দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তান এবং চীনের সিনচিয়াং প্রদেশসহ সমগ্র মধ্য এশিয়া ভূরাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক এলাকা হিসেবেই বিবেচিত ছিল। সংঘাত, বিচ্ছিন্নতা এবং শক্তিশালী দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল নিয়ে ধারণা এখন পাল্টে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে মধ্য এশিয়া এখন বাণিজ্য ও সহযোগিতার একটি উদীয়মান কেন্দ্রে পরিণত হতে চলেছে।

সেনলিং কাউন্টি প্রতিষ্ঠার কৌশলগত গুরুত্ব

এই প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণ করলে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডর সীমান্ত বরাবর চীনের ‘সেনলিং কাউন্টি’ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনুধাবন করা সহজ হয়। অনেক বিশ্লেষক এই পদক্ষেপকে কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায় এর বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়। মূলত সেনলিং কাউন্টি গঠন করার বিষয়টি চীনের আঞ্চলিক সংহতি গভীর করার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। এটি দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘ওয়াখান সড়ক’ নির্মাণের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত হতে পারে। যদি এই সড়কটি সম্পন্ন হয় তবে প্রায় এক শতাব্দী পর আফগানিস্তান ও চীনের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।

সিনচিয়াং প্রদেশের তাসকোরগান তাজিক স্বায়ত্তশাসিত কাউন্টি ভেঙে এই নতুন প্রশাসনিক এলাকা তৈরি করা চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারত সীমান্তবর্তী আকসাই চীন–সংলগ্ন এলাকায় চীন হে’আন এবং হেকং নামে দুটি কাউন্টি গঠন করেছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

২০২৫ সালে আফগানিস্তানের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য প্রায় ২৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে এবং আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে এই বাণিজ্য ১০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চীনের সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার যে ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে এটি তারই ধারাবাহিকতা। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং ২০২১-পরবর্তী আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সিনচিয়াং ও মধ্য এশিয়াকে বেইজিংয়ের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এককালে যা ছিল প্রান্তিক, আজ তা চীনের কাছে মূল ভূখণ্ড বা ‘কোর’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

ওয়াখান সড়কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ওয়াখান করিডরের মাধ্যমে আফগানিস্তান ও চীনের মধ্যে সরাসরি সংযোগের ধারণাটি বেশ পুরোনো। ২০০৯ সালে তৎকালীন আফগান সরকার আমেরিকার অনুরোধে একটি নিরাপদ বাণিজ্যপথের জন্য চীনের কাছে এই করিডর দিয়ে সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন বেইজিং এই প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে রাজি হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর ওয়াখান সড়ক নির্মাণ তাদের জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। তালেবান মনে করে এই সড়ক চীনকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং আফগানিস্তানের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে। চীনের রাষ্ট্রদূতও নাকি এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিয়েছেন।

আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

আফগানিস্তানে তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো নিরাপত্তা ও অর্থনীতির প্রশ্নে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। সেনলিং কাউন্টি স্থাপনের এই সময় এবং অবস্থান বলে দিচ্ছে যে চীন এখন আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়া নিয়ে কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং তারা অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করছে। এর মাধ্যমে বেইজিং নিজের সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। এটি একই সঙ্গে মধ্য এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রকেও একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতির উন্নয়ন মূলত আঞ্চলিক শান্তির প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর উত্তেজনার পর কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান তাদের সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে নিয়েছে। এই নতুন ঐক্য বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি করছে। উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শওকত মিরজিয়োভের মতে মধ্য এশিয়ার টেকসই উন্নয়নের জন্য আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে পরিবহন সংযোগ আবার স্থাপন করা অপরিহার্য। এর ফলে পাকিস্তানের অস্থিতিশীল সীমান্তপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আফগান পণ্যের সরাসরি চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে।

টাপি গ্যাস পাইপলাইন, কাসা-১০০০ বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ট্রান্স-আফগান রেলওয়ের মতো বড় বড় প্রকল্পগুলো এখন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। অর্থাৎ আফগানিস্তান এখন আর কেবল একটি ‘বাধা’ নয়, বরং এই অঞ্চলের একটি অন্যতম ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হয়ে উঠছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সমন্বয়

অবশ্য এসব সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় বড় নিরাপত্তাঝুঁকিও রয়েছে। ওয়াখান করিডর দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে আইএস-কে এবং ইটিএম-এর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া বাদখাশান অঞ্চলে মাদক চোরাচালানের শঙ্কা চীনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কেবল সীমান্ত পাহারা দিলে হবে না বরং সম্মিলিত নিরাপত্তা সমন্বয় প্রয়োজন। মস্কো ফরম্যাটের মতো আলোচনার প্ল্যাটফর্মগুলোতে যেখানে তালেবানও অন্তর্ভুক্ত থাকে, সেখানে এখন নিয়মিতভাবে নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে আসছে।

উপসংহার

সেনলিং কাউন্টি গঠন একটি ছোট প্রশাসনিক পরিবর্তন মনে হতে পারে; কিন্তু এর কৌশলগত গুরুত্ব বিশাল। এটি পরিষ্কার করে দেয় যে চীন তার পশ্চিম সীমান্তকে কেবল প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে নয় বরং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। যদিও ভৌগোলিক উচ্চতা এবং জঙ্গিবাদের হুমকির কারণে এই পথ নির্মাণ হতে সময় লাগবে, তবে সেনলিং কাউন্টি প্রতিষ্ঠা একটি শক্তিশালী আস্থা তৈরির উদ্যোগ।

এটি স্পষ্ট যে পারস্য উপসাগর বা লোহিত সাগরের মতো জলপথগুলোর অস্থিরতার কারণে বিশ্ব এখন বিকল্প স্থলপথের সন্ধান করছে। এই বিশ্বব্যবস্থায় ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়াজুড়ে গড়ে ওঠা বাণিজ্য করিডরগুলো কেবল অর্থনীতির চাকা সচল করবে না বরং একসময়ের বিচ্ছিন্ন আফগানিস্তানকে আবার এশিয়ার হৃৎপিণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় ভূমিকা পালন করবে।