ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সোমবার (স্থানীয় সময়) সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি ঘটে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে। ইউএসজিএস এই ভূকম্পনকে 'তীব্র ও উল্লেখযোগ্য' বলে আখ্যা দিয়েছে।
ভূমিকম্পে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২০০ জনের বেশি মানুষ। ফিলিপাইনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র জুনি কাস্টিলোর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি এ তথ্য জানিয়েছে। ভূমিকম্পের তীব্রতায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে একাধিক ভবন। জেনারেল সান্তোস শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেছে। বেশ কিছু দোকানপাট ধসে পড়েছে, কংক্রিটের ছাদ ভেঙে একটার ওপর আরেকটা স্তূপ হয়ে আছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি
২০১৯ সালের ধারাবাহিক কয়েকটি ভূমিকম্পে আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মাতানাও ন্যাশনাল হাইস্কুল। এবার শক্তিশালী ভূমিকম্পে স্কুলটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ফিলিপাইনের সরকারি স্কুলগুলোতে সবে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দাভাও অক্সিডেন্টাল প্রদেশের এক ভয়ংকর চিত্র দেখা যায়। সেখানে তীব্র কাঁপুনিতে মাটি দুলছিল, আর খোলা মাঠে আতঙ্কে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েক ডজন শিক্ষার্থী।
অন্য একটি ভিডিওতে দাভাও দেল সুর এলাকার একটি হাইস্কুলের ক্যাম্পাসের ছাদ ধসে পড়তে দেখা যায়। এ সময় স্কুলের খেলার মাঠে শিক্ষার্থীরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। তবে এই দুই ঘটনার কোনোটিতেই হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। জেনারেল সান্তোস শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা ভূমিকম্পের সময় টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়ার কথা জানান। নটর ডেম অব দাদিয়াঙ্গাস ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট রয়টার্সকে বলেন, 'আমাকে বাধ্য হয়ে মাথা নিচু করে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।'
দাভাও সিটিতে সকালে পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় ভূমিকম্প শুরু হলে শতাধিক শিক্ষার্থী আঘাত পায়। অনেকেই আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আঞ্চলিক জরুরি বিভাগের কর্মকর্তা এদনার দায়াংহুরং বার্তা সংস্থা এপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তিনি সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট মার্কোস বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশের আমার দেশবাসীদের বলছি, দয়া করে সুনামির সতর্কবার্তায় কান দিন। এক্ষুনি উঁচু জায়গায় চলে যান। একদম অপেক্ষা করবেন না। ফেলে যাওয়া যেকোনো সহায়-সম্বলের চেয়ে আপনাদের জীবনের মূল্য অনেক বেশি।'
সুনামি সতর্কতা
এই ভূমিকম্পের পরপরই ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, হাওয়াই দ্বীপে সুনামির কোনো শঙ্কা নেই। প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার জানিয়েছে, ভূমিকম্পের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর সুনামির মূল শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ওঠানামা করতে পারে। তাই তারা জনসাধারণকে সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিপাইনের সারাঙ্গানি প্রদেশের আলাবেল শহরের পুলিশপ্রধান বেনজি আনচেতা রয়টার্সকে জানান, তাঁদের পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠান চলছিল। ভূমিকম্পের পরপরই পুলিশ ভবনে বেশ কিছু ফাটল দেখা দেয়। আনচেতা আরও বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে শক্তিশালী এই ভূকম্পনে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। টেলিফোনে তিনি রয়টার্সকে বলেন, 'আমাদের অভিজ্ঞতায় এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।'
ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান ভৌগোলিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার' বা 'অগ্নিবলয়'-এ অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকা ঘিরে থাকা এই ফল্টলাইন বা ভূস্তরীয় চ্যুতিরেখার কারণে এসব এলাকায় ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। গত বছরও ফিলিপাইনে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছিল। সে সময় দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় সেবু দ্বীপে অন্তত ৭৪ জনের মৃত্যু হয়।



