চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আজ দুই দিনের সফরে উত্তর কোরিয়া গেছেন। এই সফর কতটা বন্ধুত্বের আর কতটা প্রভাব খাটানোর কৌশল, তা এখন দেখার অপেক্ষা। চীন ও উত্তর কোরিয়া প্রায়ই তাদের সম্পর্ককে ‘রক্তের বন্ধনে গড়ে ওঠা’ বলে উল্লেখ করে, যা কোরিয়া যুদ্ধের সময়কার তাদের যৌথ ইতিহাসের প্রতি ইঙ্গিত করে।
চীনের কৌশলগত অবস্থান
চীন তার সীমান্তে স্থিতিশীলতা ও পিয়ংইয়ংয়ের ওপর প্রভাব চায়। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত সংকটে জড়িয়ে পড়তে চায় না। সিউলের বিশ্বাস, উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চীনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতে পারেন সি চিন পিং। তবে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্য ভিন্নও হতে পারে।
রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ
পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো বিবিসিকে বলেছে, পিয়ংইয়ং ও মস্কোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব নিয়ে চীন ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীন সফর করেন। সি চিন পিং সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, বিশেষ করে যখন বেইজিং বিশ্বমঞ্চে নিজের উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে।
সূক্ষ্ম হলেও বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দিয়েছে। গত মাসে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন না। বছরজুড়ে উচ্চপর্যায়ের কোনো আদান-প্রদানও হয়নি। মস্কোর সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ক্রমবর্ধমান উষ্ণ সম্পর্কের তুলনায় এটা একেবারেই বিপরীত চিত্র।
উত্তর কোরিয়ার রাশিয়া নির্ভরতা
ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর উত্তর কোরিয়া পুতিনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। পরে ২০২৪ সালে পিয়ংইয়ং সফরের সময় পুতিন একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে লড়াই করতে গিয়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন। তেল ও অন্যান্য সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়ার যুদ্ধে গোলাবারুদ সরবরাহ করার অভিযোগও তোলা হয়েছে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে—যা ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের উদ্বিগ্ন করেছে। বিষয়টি নীরবে চীনকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে।
কার্নেগি এন্ডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পারমাণবিক নীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত পান্ডা বলেন, ‘মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে দ্রুত ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির এই সময়ে চীন চায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ যেন সুরক্ষিত থাকে।’
চীনের প্রতিরক্ষা চুক্তি
বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়া চীন ও রাশিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এদিকে একটিমাত্র দেশের সঙ্গে চীনের আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, দেশটি উত্তর কোরিয়া। তাই বেইজিং সম্ভবত এমন কোনো পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাবে না, যেখানে রাশিয়া পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয় এবং কিম জং–উনের ওপর চীনের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা কমে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে বেইজিং সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। গত বছরের শেষ দিকে কিমকে বেইজিংয়ে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান সি চিন পিং। ওই অনুষ্ঠানে পুতিনের পাশাপাশি কিমকে নিজের পাশে উল্লেখযোগ্য সময় ধরে রাখেন চীনের প্রেসিডেন্ট। ছয় বছরের মধ্যে সেটি ছিল তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠক। সি চিন পিং তাঁকে (কিম জং–উন) ‘ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু এবং অভিন্ন ভাগ্যের বন্ধনে আবদ্ধ ভালো সহযোদ্ধা’ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সমন্বয়ের আহ্বান জানান। তবে জনসমক্ষে দেওয়া সি–র ওই বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্পর্কে কোনো উল্লেখ ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া সেন্টারের ভিজিটিং স্কলার লি সেয়ং-হিয়ন বলেন, পিয়ংইয়ং ও মস্কোর ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব নিয়ে বেইজিংয়ের ‘মিশ্র অনুভূতি’ রয়েছে। লি বলেন, একদিকে এই অংশীদারত্ব ‘ওয়াশিংটনের মনোযোগ সরিয়ে দেয় এবং একাধিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে জটিল করে তোলে, যা পরোক্ষভাবে চীনের জন্য লাভজনক’। তবে লি আরও বলেন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় সামরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে, যা বেইজিংয়েরে জন্য উদ্বেগজনক।
এ কারণেই চীন পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সমর্থন করছে না। কারণ, তাহলে এই অঞ্চলে এবং আঞ্চলিক মিত্র জোটে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আরও বেড়ে যাবে। তবে চীন বিষয়টি সরাসরি মোকাবিলাও করছে না। ২০২২ সালে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর দেশটির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের-নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবে ভেটো দেয় চীন ও রাশিয়া।
যদি চীন পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে এটি শুধু উত্তর কোরিয়াকে আরও বেশি করে পুতিনের ঘনিষ্ঠ করে তুলবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর চা।
বাস্তববাদী অংশীদারত্ব
তবে কিম তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়তার উৎসকেও দূরে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন না। গত বছর উত্তর কোরিয়ায় চীনের পণ্য রপ্তানি প্রায় ২৩০ কোটি ডলারে পৌঁছে গেছে, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ছয় বছর বন্ধ থাকার পর এ বছরের শুরুতে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবাও আবার চালু হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটিও বেইজিংয়ের একটি কৌশল—পিয়ংইয়ংকে আবার নিজের প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে আনা।
আর কিমের জন্য এটি একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা কমে যেতে পারে। আর বিচ্ছিন্ন পুতিনের বিপরীতে, সি চিন পিং বেইজিংয়ে বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানাচ্ছেন। ফলে কিমকে নিশ্চিত করতে হবে, তিনি যেন কোনো দুর্বল হয়ে পড়া অংশীদারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়েন।
তবে কিম চীনের সুরক্ষা চান, চীনের নিয়ন্ত্রণ নয়। দুপক্ষই একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। তবে আপাতত, তারা উভয়েই মনে করে, তাদের একে অপরকে প্রয়োজন আছে এবং সেটাই তাদের যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।



