চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আজ সোমবার দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া পৌঁছেছেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন ও তাঁর স্ত্রী রি সল জু বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে সিকে স্বাগত জানান। দেশটির সরকারি টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, সিয়ের বিমান অবতরণের সময় কিম ও তাঁর স্ত্রী করতালি দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন।
স্বাগত অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকতা
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এ সময় উত্তর কোরিয়ার শিশুরা তাঁদের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেয়। পিয়ংইয়ংয়ের কিম ইল সুং স্কয়ারে আয়োজিত স্বাগত অনুষ্ঠানে সি চিন পিংকে অভ্যর্থনা জানাতে অশ্বারোহী বাহিনী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, এ আয়োজনে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ ফুল ও জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির খবরে বলা হয়, ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অভিবাদন জানানোর পর দুই নেতা গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন। এ সময় গার্ড অব অনারের সদস্যরা কোরীয় ভাষায় স্লোগান দেন, ‘কমরেড সি চিন পিংয়ের সুস্বাস্থ্য কামনা করি।’
সফরের গুরুত্ব ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
চলতি বছরে এটিই সি চিন পিংয়ের প্রথম বিদেশ সফর। এর কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি বেইজিংয়ে পৃথকভাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এমন সময়ে এই সফর হচ্ছে, যখন বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর সিয়ের জন্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ তৈরি করবে। পিয়ংইয়ং পৌঁছানোর আগে সি সংবাদমাধ্যমে বলেন, চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক এখন ‘নতুন এক ঐতিহাসিক সূচনাবিন্দুতে’ পৌঁছেছে।
সি চিন পিংয়ের বক্তব্য
সি চিন পিংয়ের এই সফর বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কারণ, এটি চলতি বছরে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। একই সঙ্গে গত সাত বছরের মধ্যে উত্তর কোরিয়ায় এটি তাঁর প্রথম সফর। উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম রোদং সিনমুনকে সি বলেন, চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। দুই দেশ সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করবে।
সি চিন পিং বলেন, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে এমন আধিপত্যবাদ, কর্তৃত্ববাদ এবং সামরিকতাবাদ পুনরুজ্জীবিত করার সব ধরনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান নিতে হবে।’ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বেইজিংয়ের এই বার্তার লক্ষ্য হলো পিয়ংইয়ংকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে নিজেদের কূটনৈতিক বলয়ে রাখা।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও আঞ্চলিক প্রভাব
দুই দিনের এই সফরে সি চিন পিং ও কিম জং-উনের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এমন এক সময়ে এই বৈঠক হচ্ছে, যখন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ফলে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। এশিয়া সোসাইটির জ্যেষ্ঠ ফেলো জন ডেলুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘সির এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় ধরে রাখা।’
পিয়ংইয়ংয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ
পিয়ংইয়ংজুড়ে চীন-উত্তর কোরিয়ার পতাকা সি চিন পিংয়ের সফর উপলক্ষে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান সড়কগুলোয় চীন ও উত্তর কোরিয়ার জাতীয় পতাকা টানানো হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সি চিন পিংকে স্বাগত জানিয়ে ব্যানারও টানানো হয়েছে।
গত বছর বেইজিংয়ে আয়োজিত এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে কিম জং-উনসহ বিভিন্ন দেশের নেতা অংশ নিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও সি চিন পিংকে দেখা যায়। এর পর থেকে উত্তর কোরিয়া ও চীনের সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত আবার শুরু হয়েছে। করোনা মহামারির সময় স্থগিত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন বিনিময় কর্মসূচিতেও গতি ফিরেছে। চলতি বছরের মার্চে দুই দেশের রাজধানীর মধ্যে বিমান চলাচলও আবার চালু করে এয়ার চায়না।
সামরিক প্রদর্শনী ও প্রেক্ষাপট
সি চিন পিংয়ের সফরের ঠিক আগের দিন নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটি ১০ হাজার টন ওজনের একটি নতুন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে।



