চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন ও অবরোধ মোকাবিলায় নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করছে তাইওয়ান। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৯ সালের শুরুর দিকে দেশটির জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১ হাজার ৮০০ ছাড়িয়ে যাবে। এই তথ্য সামা টিভি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অসমমিত প্রতিরক্ষা কৌশল
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ান বর্তমানে ‘অসমমিত প্রতিরক্ষা কৌশল’ অনুসরণ করছে। এই কৌশলের মাধ্যমে চীনের বিপুল সামরিক শক্তির মোকাবিলায় তুলনামূলক কম খরচের কিন্তু কার্যকর অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি স্বল্প-পাল্লার অস্ত্র, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক ড্রোনও যুক্ত করা হচ্ছে।
প্রথম ধাক্কা সামলে পাল্টা আঘাত
বর্তমান ও সাবেক তাইওয়ানি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, চীনের সম্ভাব্য বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রথম ধাক্কা সামলে পরে আক্রমণকারী নৌবহর বা অবরোধকারী জাহাজে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় তাইওয়ান। এ ক্ষেত্রে ইউক্রেন ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে দেশটি।
ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার
তাইওয়ানের জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডারের মূল শক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা হারপুন ক্ষেপণাস্ত্র এবং দেশীয়ভাবে তৈরি হসিয়ুং ফেং-২ ও হসিয়ুং ফেং-৩ ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যক এসব অস্ত্র তাইওয়ান প্রণালিতে একটি ‘কিল জোন’ তৈরি করতে পারে, যেখানে চীনা নৌবহর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
লক্ষ্য: চীনা যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস নয়
তাইওয়ানের শীর্ষ সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষণা বিভাগের উপপ্রধান ও সি-ফু বলেন, “আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি চীনা যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করা নয়, বরং তাদের অবতরণ ও সামরিক অভিযান সফল হতে না দেওয়া।”
যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল ও সামরিক বিশ্লেষক গ্রান্ট নিউশামের মতে, দূরপাল্লার নির্ভুল জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
চীনের নৌশক্তি
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাইওয়ানে আক্রমণ চালাতে হলে চীনকে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ ও বেসামরিক পরিবহন জাহাজ মোতায়েন করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী এবং বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজ বহর রয়েছে চীনের।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তাদের সামুদ্রিক আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াবে এবং শত্রুপক্ষের যুদ্ধক্ষমতা দুর্বল করবে। তবে নিরাপত্তার কারণে এসব অস্ত্রের অবস্থান ও মোতায়েনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
হারপুন ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৪৫০টি হারপুন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এছাড়া ২০২০ সালে অনুমোদিত ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির আওতায় আরও ৪০০টি হারপুন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হবে। সবগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এভাবে ২০২৯ সালের মধ্যে তাইওয়ানের হারপুন ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৮৫০টি। এর সঙ্গে দেশীয়ভাবে তৈরি প্রায় ১ হাজার বা তার বেশি হসিয়ুং ফেং ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হলে মোট জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮৫০-এ পৌঁছাবে।
সময়সীমা নির্ভর করছে সরবরাহের ওপর
তবে এ হিসাব নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়ার ওপর। উৎপাদন জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে সরবরাহ বিলম্বিত হলে সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে জানিয়েছেন এক তাইওয়ানি কর্মকর্তা।
নতুন অস্ত্র প্যাকেজের প্রচেষ্টা
এদিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্যের নতুন অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনের চেষ্টা করছে তাইওয়ান। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চীনের দাবি ও তাইওয়ানের অবস্থান
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের পথও খোলা রেখেছে। তবে তাইওয়ান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র তাইওয়ানের জনগণেরই রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাইওয়ান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোননির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।



