ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘আরশোলা জনতা পার্টি’ নামে এক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক মঞ্চ। মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রায় চল্লিশ হাজার সদস্য সংগ্রহের দাবি করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এই উদ্যোগ। তবে শুধু নামের অদ্ভুততার কারণে নয়, বরং এর পেছনে থাকা বিতর্কই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
বিতর্কের সূত্রপাত
সম্প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে একটি শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মৌখিক মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কর্মসংস্থানহীন কিছু তরুণ ও ভুয়ো ডিগ্রিধারীদের প্রসঙ্গে তিনি ‘ককরোচ’ বা আরশোলার উদাহরণ টেনেছিলেন। সেই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আদালতের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনার ঝড় ওঠে।
পরে অবশ্য প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে জানান, তার মন্তব্য দেশের সাধারণ বেকার যুবকদের উদ্দেশে ছিল না। বরং যারা ভুয়ো ডিগ্রি বা জাল পরিচয়ে বিভিন্ন পেশায় ঢোকার চেষ্টা করছেন, তাদের প্রসঙ্গেই তিনি কথা বলেছিলেন। আদালতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, মন্তব্যের একটি অংশ ভুলভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়ে গেছে ব্যঙ্গ, সমালোচনা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
‘আরশোলা জনতা পার্টি’র আত্মপ্রকাশ
সেই আবহেই আত্মপ্রকাশ করে ‘আরশোলা জনতা পার্টি’। নিজেদের পরিচয় দিয়েছে তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গমঞ্চ হিসেবে। দলের মূল বক্তব্য হলো বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রচলিত রাজনীতির প্রতি তরুণদের অনাস্থাকে সামনে আনা। দলটির দাবি, মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তাদের সদস্য সংখ্যা চল্লিশ হাজারে পৌঁছেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দ্রুত বাড়ছে অনুসারীর সংখ্যা।
সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গের দুই পরিচিত সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদকেও নিজেদের দলে স্বাগত জানিয়েছে এই মঞ্চ। মহুয়া মৈত্র মজা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, তিনিও এই দলে যোগ দিতে চান। কীর্তি আজাদ জানতে চান, দলে যোগ দেওয়ার জন্য কী যোগ্যতা প্রয়োজন। উত্তরে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, উনিশশো তিরাশির ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় করাই যথেষ্ট। এই কথোপকথন দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে।
প্রতিষ্ঠাতা ও ঘোষণাপত্র
দলটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উঠে এসেছে অভিজিৎ দীপকের নাম। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তিনি আগে রাজনৈতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক প্রচারণা এবং অনলাইন জনমত তৈরিতে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও জানা গেছে। দলটির ঘোষণাপত্রেও রয়েছে ব্যঙ্গাত্মক ভাষা। নিজেদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস সংগঠন হিসেবে।
সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবেও বলা হয়েছে, বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং অভিযোগ করার দক্ষতা থাকতে হবে। তবে শুধু হাস্যরসেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই মঞ্চ। পরীক্ষায় দুর্নীতি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলবদল এবং সংসদে নারীদের অর্ধেক আসন সংরক্ষণের মতো বিষয়েও সরব হয়েছে তারা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎ
এরই মধ্যে কৃত্রিম মেধা ব্যবহার করে গানও প্রকাশ করেছে দলটি। সেই গানে নিজেদের ‘জ্বলন্ত শহরের সন্তান’ বলে তুলে ধরা হয়েছে। তরুণদের আকৃষ্ট করতে অনলাইন সম্মেলনেরও ডাক দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি নিছক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাস্যরস নয়। এর মধ্যে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক হতাশা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং তরুণদের ক্ষোভের প্রতিফলন রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর রাজনীতির যুগে এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বলেও মত তাদের।
তবে ‘আরশোলা জনতা পার্টি’ ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে, নাকি শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু মাত্র দুই দিনের মধ্যেই যে তারা জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।



