জায়নবাদের উৎপত্তি: সমাজতন্ত্রবিরোধী হাতিয়ার হিসেবে ইতিহাস
জায়নবাদ: সমাজতন্ত্রবিরোধী অস্ত্রের জন্মকথা

বর্তমান বিশ্বে প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও ফিলিস্তিনপন্থী সংহতি আন্দোলনগুলোর ওপর ইসরাইলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক আক্রমণ কোনো নতুন বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি একটি সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ, যা উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু হয়েছে। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, জায়নবাদী নেতারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে নিজেদের আন্দোলনকে সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিজম প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী প্রাচীর বা হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিলেন। পশ্চিমা শক্তিগুলোও এই আন্দোলনকে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা রুখে দেওয়ার কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

সাম্প্রতিক আক্রমণের নজির

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সমাজতান্ত্রিক নেতাদের ওপর ইসরাইলপন্থীদের চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের নির্বাচনি সম্ভাবনা নস্যাৎ করা, মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকে কোণঠাসা করতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের অর্থায়ন করা এবং বর্তমান সময়ে ফ্রান্সের সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলেনশঁকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে কলঙ্কিত করার চেষ্টা—সবই এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। একই সঙ্গে স্পেনের পেদ্রো সানচেজের সমাজতান্ত্রিক সরকারকে দুর্বল করতে দেশটির চরম ডানপন্থী ‘ভক্স’ পার্টিকে সমর্থন দেওয়া এবং আয়ারল্যান্ডের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে লবিং করার পেছনেও এই একই উদ্দেশ্য কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঐতিহাসিক শিকড়

জায়নবাদের এই সমাজতন্ত্রবিরোধী ইতিহাসের শিকড় মূলত এর প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জেলের সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৮৯০-এর দশকে জার্মানির কায়সার এবং তার মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে হার্জেল আশ্বাস দিয়েছিলেন যে জায়নবাদ ইহুদিদের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখবে। ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক জোটের পেছনেও ছিল তীব্র কমিউনিজমভীতি। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার ‘অক্টোবর বিপ্লব’ সফল হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে ব্রিটেনের ‘বেলফোর ঘোষণা’ প্রকাশের সময়কালটি কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না। ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করেছিলেন যে রুশ ইহুদিরা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, আর তাই তাদের সমাজতান্ত্রিক প্রোপাগান্ডা থেকে দূরে রাখতে ফিলিস্তিনে একটি ‘ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনও একই আশঙ্কায় এই ঘোষণাকে সমর্থন করেছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ এবং উইনস্টন চার্চিলও কমিউনিজমকে একটি ‘ইহুদি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখতেন এবং এর বিপরীতে জায়নবাদকে একটি বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদঘেঁষা সমাধান হিসেবে বিবেচনা করতেন। ১৯২২ সালে জায়নবাদী নেতা চেইম ওয়াইজম্যান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের ফিলিস্তিনে অবস্থানরত কমিউনিস্ট ইহুদিদের দমন করার আহ্বান জানিয়ে স্পষ্ট করেছিলেন যে জায়নবাদ ও বলশেভিজম একে অপরের চরম শত্রু।

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর

১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও তাদের এই বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রবিরোধী নীতি অব্যাহত থাকে। সিরিয়া এবং মিশরের মতো সমাজতান্ত্রিক ধারার আরব দেশগুলোর ওপর আক্রমণ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রচারণায় তারা লিপ্ত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, চিলির পিনোচে সরকার এবং আর্জেন্টিনার ডানপন্থী সামরিক জান্তাসহ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারকে ইসরাইলের সামরিক সহায়তা দেওয়ার পেছনেও ছিল এই সমাজতন্ত্রবিরোধী অবস্থান।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

বর্তমান সময়ে ফ্রান্সের মেলেনশঁ এবং তার দল ‘লা ফ্রান্স ইনসুমিস’-কে ডানপন্থী ও ইসরাইলপন্থীরা ‘ইসলামো-বলশেভিক’ বলে আখ্যায়িত করছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যেসব প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক শক্তি সোচ্চার হয়েছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে ইসরাইল ও তার মিত্ররা এখন বিশ্বজুড়ে একযোগে কাজ করছে। এই ধারা ইঙ্গিত দেয় যে জায়নবাদের সমাজতন্ত্রবিরোধী ভূমিকা এখনও শেষ হয়নি, বরং নতুন মোড় নিয়েছে।