মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর শেষ হতে না হতেই মঙ্গলবার (১৯ মে) দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রাক্কালে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ককে ‘নজিরবিহীন’ গভীর বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার স্তরে রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন পুতিন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার এই গভীর বন্ধন বিশ্বমঞ্চে একটি ‘স্থিতিশীল’ শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
সফরের প্রেক্ষাপট
পুতিনের এই চীন সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে চরম এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর ঠিক আগেই ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠকটি বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ও এর পরিচালন ব্যবস্থার প্রসারে একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যকার ‘সৎ-প্রতিবেশীসুলভ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনের অংশ হিসেবে পুতিনের এই সফরের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুতিনের বক্তব্য
সফরে রওনা হওয়ার আগে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, মস্কো ও বেইজিং কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট বাঁধতে চায় না, বরং তারা ‘শান্তি এবং বৈশ্বিক সমৃদ্ধির’ জন্য একসঙ্গে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ব্রিকস এবং অন্যান্য বহুমাত্রিক প্ল্যাটফর্মের কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাকে সমর্থন করে, যা জরুরি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সমাধানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।’ সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় সংহতিসহ দুই দেশের মূল স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একে অপরকে সমর্থন করতে প্রস্তুত উল্লেখ করে পুতিন বলেন, ‘এই মনোভাব নিয়েই মস্কো এবং বেইজিং আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদের নীতিগুলোকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি না, বরং শান্তি ও সর্বজনীন সমৃদ্ধির স্বার্থে কাজ করছি।’
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে আরও জোরদার হয়েছে। বেইজিং মস্কোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। মেক্যাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাশিয়া ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ হয়ে ২৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চীনে রাশিয়ার রফতানি পণ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে তেল, গ্যাস এবং কয়লা। বিপরীতে চীন থেকে রাশিয়ায় সরবরাহ করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, যানবাহন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য।
বৈশ্বিক প্রভাব
এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন চীন ও রাশিয়া উভয় দেশই ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজস্ব সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এই দুই দেশসহ বিশ্বের বহু জাতির জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। এই যুদ্ধকালীন পটভূমিতে দুই শীর্ষ নেতার এই বৈঠককে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস-এর একটি নিবন্ধে ‘বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ এই সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছেন, দুই নেতা একটি ‘বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলার বিষয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করবেন। এ ছাড়া বৈঠকে বহুল আলোচিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ গ্যাস পাইপলাইনের বিষয়েও শি ও পুতিনের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।



