ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা যখন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, তখন নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ভাগ্য বদলের বড় সুযোগ দেখছে তুরস্ক। কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণ ককেশাস এবং তুরস্ক হয়ে চীন ও মধ্য এশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তকারী ‘মিডল করিডোর’ বা মধ্যবর্তী বাণিজ্য পথটিকে জনপ্রিয় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে আঙ্কারা। তবে এই পথটিকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর পেছনে বড় ধরনের পরিবহন, আর্থিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মিডল করিডোরের উত্থান
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর রাশিয়া ও বেলারুশের মধ্য দিয়ে যাওয়া উত্তর দিকের স্থলপথগুলো (নর্দার্ন করিডোর) বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই মিডল করিডোরের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে শুরু করে। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এই রুটের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
তুরস্কের আগ্রহের নেপথ্যে কী?
মিডল করিডোর, যার আনুষ্ঠানিক নাম ট্রান্স-কাস্পিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট (টিআইটিআর) হলো একটি বহুমাত্রিক (রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথের মিশ্রণ) চীন-ইউরোপীয় প্রকল্প। এটি চীন থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগর, আজারবাইজান ও জর্জিয়া হয়ে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কাস্পিয়ান পলিসি সেন্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই করিডোরে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মাইল রেলপথ এবং ৩১০ মাইলের কাস্পিয়ান সাগর পারাপার ব্যবস্থা রয়েছে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই এই করিডোর বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছে। আঙ্কারা এটিকে মধ্য এশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করে। যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তানের ৩০ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল ও ৮৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তুর্কমেনিস্তানের ৪০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের গ্যাসের মজুত। একই সঙ্গে এই করিডোরকে মধ্য এশিয়ার তুর্কি প্রজাতন্ত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং তুর্কি বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত পথ হিসেবে দেখছে আঙ্কারা। এই রুটটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর সঙ্গেও মিলে যায়। এটি বেইজিংকে রাশিয়া ও ইরান এড়িয়ে ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছানোর একটি নির্ভরযোগ্য পথ তৈরি করে দেয়। ফলে তুরস্ক এটিকে নিজেদের নেতৃত্বাধীন কৌশল এবং চীনের বিআরআই-এর পরিপূরক রুট উভয় হিসেবেই উপস্থাপন করছে।
গত সপ্তাহে কাজাখস্তানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরকালে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, ‘আমাদের রেল সংযোগ, বন্দর অবকাঠামো ও ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা কাস্পিয়ান-ট্রানজিট মিডল করিডোরকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ করছি। ইউরেশীয় অঞ্চলকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও প্রতিযোগিতামূলক করাই আমাদের লক্ষ্য।’
কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে এই রুট?
২০২২ সালের আগে চীন-ইউরোপ স্থল বাণিজ্যের ৮৬ শতাংশেরই বেশি হতো রাশিয়ার নর্দার্ন করিডোর দিয়ে। যুদ্ধ সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এর ওপর চলতি বছর যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির সংকট। প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী এই সরু জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।
তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ গত এপ্রিলে বলেছিলেন, ‘ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের পর মিডল করিডোর এখন আর কেবল বিকল্প নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক পছন্দ।’
ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের তুরস্ক প্রোগ্রাম-এর অনাবাসিক ফেলো পিনার দোস্ত মনে করেন, হরমুজের এই অচলাবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করতে চায়।
তা ছাড়া, আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার ছিটমহল নাখচিভানকে আর্মেনিয়ার সিউনিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে সংযুক্ত করার জন্য মার্কিন মধ্যস্থতায় যে ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি (টিআরআইপিপি) বা ট্রিপ প্রকল্পের আলোচনা চলছে, তা সফল হলে মিডল করিডোরের কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
পাশাপাশি, ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনে ঘোষিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর, যা ভারত, আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলকে যুক্ত করার কথা ছিল; তা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ, লোহিত সাগরের সংকট এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আইমেক প্রকল্পের উপযোগিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রগুলো এড়িয়ে যাওয়া মিডল করিডোর এখন বিশ্ববাজারের কাছে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হচ্ছে।
সামনে যত চ্যালেঞ্জ
ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা থাকলেও মিডল করিডোরকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা বেশ কঠিন। পিনার দোস্ত স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘এই রুটটি হরমুজ প্রণালির বিপুল বাণিজ্য বা তেল পরিবহনের পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তার স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প হতে পারে না।’ এটি মূলত কন্টেইনার পণ্য এবং অ-জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত।
অন্যতম বড় বাধা হলো এর বিশাল খরচ। আর্মেনিয়ার মতো নতুন রুটগুলো যুক্ত করে অবকাঠামো তৈরি করতে শত শত কোটি ডলারের প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবশ্য তাদের গ্লোবাল গেটওয়ে এজেন্ডার আওতায় রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে।
লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় দুর্বলতা রয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরের অংশটি এই রুটের সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ এখানে ট্রেন থেকে পণ্য খালাস করে জাহাজে তুলতে হয় এবং ওপারে গিয়ে আবার ট্রেনে তুলতে হয়। ফলে বন্দর সক্ষমতা, ফেরির প্রাপ্যতা এবং আবহাওয়ার ওপর বাণিজ্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। এর ওপর কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার কারণে আজারবাইজান ও কাজাখস্তানকে এখন বন্দর খনন কাজের জন্য বাড়তি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।



