সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রবিবার একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় কেন্দ্রটির সীমানার ভেতরের একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। এই ঘটনার ফলে ইরান যুদ্ধের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি নতুন করে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
হামলার বিস্তারিত ও প্রতিক্রিয়া
আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি। হামলায় কোনও ধরনের তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি এবং কেউ হতাহতও হয়নি। তবে সন্দেহের তির সরাসরি ইরানের দিকেই যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের সময় আমিরাতে ইসরায়েলি আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনা মোতায়েনের সুযোগ দেওয়ার কারণে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেহরান ক্রমাগত আবুধাবিকে হুমকি দিয়ে আসছিল।
এমন এক সময়ে এই হামলাটি চালানো হলো যখন ইরান এখনও হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা এখন অবরুদ্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর জবাবে আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করার আলোচনাও স্থবির হয়ে পড়েছে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও সম্ভাব্য পরিণতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যেকোনও সময় আবারও শত্রুতা বা যুদ্ধ শুরু হতে পারে। অন্যদিকে, ইরানি জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে সে দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বারবার এমন সব অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে যেখানে উপস্থাপকদের কালাশনিকভ ঘরানার রাইফেল হাতে দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংঘাত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সেখানকার পৃথক একটি যুদ্ধবিরতিকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
বারাকাহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব
দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলার ব্যয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করে, যা ২০২০ সালে চালু হয়। এটি আরব উপদ্বীপের প্রথম এবং একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার এক-চতুর্থাংশ পূরণ করতে সক্ষম। এটি আরব বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও বটে।
আমিরাতের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, এই আগুনের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার কোনও ক্ষতি হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সংস্থাটি লিখেছে, ‘সবগুলো ইউনিট স্বাভাবিকভাবেই চালু রয়েছে।’
আমিরাতের বিবৃতিতে এই হামলার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনও পক্ষকে দায়ী করা হয়নি। জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা, ভিয়েনাভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সাড়া দেয়নি।
যুদ্ধে পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু
ইরান যুদ্ধে এই প্রথম চার রিয়্যাক্টর বিশিষ্ট বারাকাহ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে নিশানা করা হলো। কেন্দ্রটি আবুধাবির সুদূর পশ্চিম মরুভূমিতে, সৌদি আরব সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের উদ্বেগ দূর করতে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘১২৩ চুক্তি’ নামে একটি চুক্তি সই করেছিল, যেখানে তারা নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের অধিকার ত্যাগ করতে সম্মত হয়। ফলে এই কেন্দ্রের ইউরেনিয়াম বিদেশ থেকে আনা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণ শুরুর পর প্রথম এই প্রবণতা দেখা যায়। চলতি ইরান যুদ্ধের সময় তেহরানও বারবার দাবি করেছে যে তাদের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আক্রান্ত হয়েছে, যদিও রাশিয়ার পরিচালনায় থাকা সেই রিয়্যাক্টরের কোনও সরাসরি ক্ষতি বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর ঘটনা ঘটেনি।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
গত কয়েক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর আশেপাশে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনা বর্তমানে সম্পূর্ণ স্থবির। ফলে নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিটি ভেঙে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি উন্মুক্ত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা এই সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।



