মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ ইলেকট্রনিক উপায়ে গত রবিবার একটি চুক্তি সই করেছেন। সোমবার মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ওয়াশিংটন ও তেহরান রণক্ষেত্রের সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপ দিতে পারবে কি না, এই চুক্তি এখন তারই বড় পরীক্ষা। তবে চুক্তিটি নিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হলেও, এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
আগামী শুক্রবার জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানের পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সে লক্ষ্যে শুক্রবার পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। হোয়াইট হাউস এখনও চুক্তিটির চূড়ান্ত পাঠ্য প্রকাশ করেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে জানতে চাইলেও তারা কোনও জবাব দেয়নি।
চুক্তিটি ঘিরে এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে এমন ৮টি মূল প্রশ্ন। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
চুক্তিটি কি আসলেই কার্যকর হয়েছে?
রবিবার ইলেকট্রনিক সইয়ের পর ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি এখনও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। ট্রাম্প রবিবারই প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও পরে জানান, শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক সইয়ের পরই এটি ঘটবে। মার্কিন সামরিক বাহিনীকে আগামী শুক্রবার অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার দাবি করলেও ইরানি গণমাধ্যম বলছে, প্রণালির পরিস্থিতিতে কোনও পরিবর্তন আসেনি।
হরমুজ প্রণালি কি আসলেই ‘উন্মুক্ত’ হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী কোনও ধরনের শুল্ক ছাড়াই এই নৌপথ খুলে দেওয়া হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরবে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায়’ ফিরবে না এবং এর ওপর ইরানের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান ৬০ দিন টোল না নিতে সম্মত হলেও এরপর থেকে ‘নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ফি’ নেওয়া শুরু করবে। ফলে শিপিং কোম্পানিগুলো এখনও সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরান আসলে কী পাচ্ছে?
উভয় পক্ষই একমত যে ইরান দুটি বড় সুবিধা পাচ্ছে: যুদ্ধ থেকে মুক্তি এবং তেল রফতানির জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে সাময়িক ছাড়। তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করছে, শুধু সই করার কারণেই তেহরান অবরুদ্ধ থাকা কোটি কোটি ডলারের তহবিল ফেরত পাচ্ছে। একজন সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা এই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ইরান কেবল তাদের ‘কাজের ওপর ভিত্তি করে’ ওই অর্থ পাবে। তবে মার্কিন প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরান যদি সদিচ্ছা দেখায় তবে যুক্তরাষ্ট্রও শুরুতে কিছু অবরুদ্ধ অর্থ ও নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের মতো ‘ছোট পদক্ষেপ’ নিতে পারে।
দুই পক্ষ কি একই বিষয়ে একমত হতে পেরেছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তিটির শর্ত এবং প্রাপ্তি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিচ্ছে। এর বড় কারণ হলো, এই আলোচনাটি মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হয়েছে এবং এটি কোনও বিস্তারিত চুক্তি নয়, বরং একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতা। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, ‘আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন যে চুক্তিটি নিয়ে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন দলের দাবির চেয়ে আলাদা মনে হচ্ছে।’ অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, দেশের জনগণকে শান্ত রাখতে ইরান চুক্তিটিকে বাড়িয়ে বলছে।
চুক্তির মূল অনুলিপি কি প্রকাশ হবে?
চুক্তির মূল অনুলিপি প্রকাশ পেলে এই বিভ্রান্তির অনেকটাই দূর হতো। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য প্রকাশ করা হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী শুক্রবারের আগে এটি প্রকাশ নাও হতে পারে।
ইসরায়েল কি এই চুক্তি মেনে চলবে?
ইসরায়েলে আগামী চার মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং দেশটির সব রাজনৈতিক মহল থেকেই এই চুক্তির সমালোচনা করা হচ্ছে। কারণ, এর ফলে লেবাননেও ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি পালন করতে হবে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সাফ জানিয়েছেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না এবং হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার ছাড়বে না। তবে রবিবার বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার কারণে এই চুক্তি প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হলে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কোনও বিচারবুদ্ধি নেই।
শেষ পর্যন্ত কি কোনও পারমাণবিক চুক্তি হবে?
এই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্যই হলো আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পারমাণবিক আলোচনা শুরু করা। ইরানের চাওয়া বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের মতো বিষয়গুলো একটি অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস্যতার কারণে এই চুক্তি করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন।
পারমাণবিক চুক্তি না হলে কি যুদ্ধ আবার শুরু হবে?
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, একটি চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো অতিরিক্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন না। তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাদের চুক্তি করতে বাধ্য করবে। আর কূটনীতি ব্যর্থ হলে ট্রাম্পের কাছে এখনও অন্যান্য ‘হাতিয়ার’ রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ছিলেন, তাই এখন সুবিধা তাদের হাতে।
মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই আমরা বুঝতে পারব এই সমঝোতাগুলো আসলে কোনও বাস্তব চুক্তিতে রূপ নেবে কি না।



