যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি আমেরিকান তাদের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৪০ হাজার দ্বৈত নাগরিকত্বধারী আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ায় আছেন বা এ সংক্রান্ত তথ্য নিচ্ছেন।
কর আইন বড় কারণ
নাগরিকত্ব ত্যাগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে মার্কিন কর আইন ‘ফ্যাক্টকা’। এই আইনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অর্জিত আয়ের ওপর কর আরোপ করে এবং বার্ষিক রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে। বিশ্বের মাত্র দুটি দেশে এই নিয়ম রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরিত্রিয়া। এই আইনের কারণে ইউরোপের ব্যাংকগুলো প্রায়ই মার্কিন নাগরিকদের অ্যাকাউন্ট খুলতে বা ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা প্রবাসীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। বিশেষ করে ‘অ্যাক্সিডেন্টাল আমেরিকান’—যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও কখনো সেখানে থাকেননি বা কাজ করেননি—তাদের জন্য এই করের বোঝা এক দুঃস্বপ্নের মতো।
রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণ
কর আইনের পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ এবং বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের ওপর করের বোঝা—এই দুই কারণে অনেকে নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন। ৩৪ বছর বয়সি এরিন ক্ল্যাট, যিনি ১০ বছর আগে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তিনি ২,৩৫০ ডলার পরিশোধ করে নাগরিকত্ব ত্যাগের শপথ নেন। তার মতে, ট্রাম্পের শাসন ও করের বোঝা ছিল মূল কারণ।
অনেকের ক্ষেত্রে নিজস্ব পরিচয়ের দ্বিধাদ্বন্দ্বও বড় ভূমিকা রাখে। ইতালিতে বসবাসরত ক্যারোলিন চিরিচেলার মতো অনেকে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে নিজেকে পুরোপুরি কোনো এক জাতির মনে করতে পারেন না। তিনি কেবল ইতালির পাসপোর্ট রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রক্রিয়া সহজ নয়
মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করা সহজ নয়। অন্য কোনো দেশের বৈধ নাগরিকত্ব না থাকলে কেউ এটি করতে পারেন না। বিগত পাঁচ বছরের ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল এবং সম্পদ মূল্যায়নের মতো জটিল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। নিউ ইয়র্কের অভিবাসন আইনজীবী ব্র্যাড বার্নস্টাইন সতর্ক করে বলেন, অনেকে সাময়িক ক্ষোভ বা আর্থিক সুবিধার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে অনুশোচনার কারণ হতে পারে। একবার নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে যাওয়ার জন্যও ভিসা লাগবে, যার কোনো গ্যারান্টি নেই।
তবে ফি কমানোর কারণে অনেকে দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ করতে চাচ্ছেন। মিসৌরি থেকে সিসিলিতে বসবাস করা ৫৩ বছর বয়সি জেনিফার সনট্যাগ জানান, ট্রাম্পের নির্বাচনই তার দেশ ছাড়ার মূল কারণ। তিনি এখন কর ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে নাগরিকত্ব ত্যাগের কাগজপত্রের অডিট করাচ্ছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত স্বস্তির হলেও কিছুটা দুঃখের, কারণ আমেরিকান পরিচয় তার সত্তারই অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক বা আর্থিক নয়, এটি মানুষের মানসিক ও সামাজিক পরিচয় পুনর্গঠনের একটি বড় অংশ। সূত্র: সিএনএন।



