জঙ্গিবাদের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
জঙ্গিবাদের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: অধ্যাপক ফজলুল হক

শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। সমাজচিন্তাশীল ও রাজনৈতিক লেখার জন্য তিনি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখির বাইরেও তিনি ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি ছিলেন তিন বছর। এ ছাড়া ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি’র ২৮ দফা প্রণয়ন করেন এই চিন্তাবিদ।

তিনি ২১টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪), রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’। এছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম।

২২ জুন ২০১৬, জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতির নানা প্রেক্ষাপট নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন শারমিনুর নাহার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশে মৌলবাদী শক্তির বিকাশ

প্রশ্ন: দেশে জঙ্গিবাদী শক্তি বেশ কিছুদিন থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। এগুলোর সবই যে তাদের দ্বারা হয়েছে, এমনটা প্রমাণিত নয়। কিন্তু সার্বিকভাবে দেশে মৌলবাদী শক্তির একটি বিকাশ হয়েছে বলে কি আপনি মনে করেন?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উত্তর: দেশে অত্যন্ত জটিল অবস্থা তৈরি হয়েছে। যখন যে সমস্যার সমাধান করা উচিত ছিল, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো সরকারই তা করেনি। ৩৫ বছর ধরে এই জটিলতা বাড়তে বাড়তে বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন হয়েছে তীব্রভাবে। কোনো দেশেই সামাজিক চাহিদা ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সরকারের পরিকল্পনায় মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন বিশ্ববাসীর ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই সময় বিবিসি, সিএনএন, ভয়েজ অব আমেরিকা, স্কাই নিউজ ক্রমাগত এই মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে উসকানি দিয়েছে। আমাদের দেশে সবার আগে বামপন্থী দলগুলো, কিছু বুদ্ধিজীবী এর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইসলামি দলগুলো। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন বড় হতে হতে তাবলিগ জামাত বড় হয়েছে। এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তর জামাত তবলিগ জামাত, যা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর পর সুফি সম্মেলন হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, হিযবুত তাহরীর ইত্যাদি ইসলামি সংগঠন হয়েছে। মন্দির, মসজিদ, দরগা, খানকা সারা দেশে অনেক বেড়ে গেছে। এসবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কী, এগুলো তখন কেউ চিন্তা করে দেখেনি।

বৃদ্ধির পেছনের কারণ

প্রশ্ন: এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনের কারণ কী বলে মনে করেন?

উত্তর: মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার অন্তত বছর দশেক আগেই আমেরিকা, ব্রিটেন ও অন্যান্য বড় শক্তি তা বুঝতে পেরেছিল। তখন তারা মনে করেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে সমাজতন্ত্রের চাপটা সাম্রাজ্যবাদীদের ওপর থাকবে না। মানুষ সমাজতন্ত্র নিয়ে হতাশ হবে। গণতন্ত্র নিয়ে মানুষ নতুনভাবে আশান্বিত হয়ে উঠবে। গণতন্ত্র একটি সংগ্রামী, শক্তিশালী মতবাদ হিসেবে গড়ে উঠবে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোই গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকে নষ্ট করার উপায় খুঁজেছে। এ জন্য তারা মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন—এগুলো সামনে তুলে এনেছে। এসব আন্দোলন দিয়ে সূক্ষ্মভাবে মৌলবাদীদের আঘাত করতে চেয়েছিল সাম্রাজ্যবাদীরা।

এই পরিস্থিতিতে ভারতে মৌলবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছে। যার ফল বা পরিণতিতে আজ সে দেশে বিজেপি ক্ষমতায় দাঁড়িয়ে গেছে। এই আন্দোলনের মধ্যেই ভারতে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৪৫০ বছর ধরে যে মসজিদ-মন্দির হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির স্মারক হয়ে কাজ করছিল—সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিজেপি নেতা আদভানি বাবরি সমজিদ ভাঙার পরই বলেছিলেন, ‘আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য আগ্রার তাজমহল। মুসলমানদের সৃষ্টি বলে এগুলোকে আমরা ভাঙছি না বরং এগুলো সাম্রাজ্যবাদের চিহ্ন, আমাদের পরাধীনতার চিহ্ন বহন করে বলে এগুলোকে ধ্বংস করা হবে।’ যাই হোক, যদিও পরে আর তাজমহল ভাঙা হয়নি। কিন্তু উগ্রবাদী কথাগুলো নব্বইয়ের দশকে বেশ ব্যাপক হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে আরো অনেক কিছুই হয়েছে। এসবের দ্বারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোও আরেক ইতিহাস। আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছে। ইরানে খোমিনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব হয়েছে। আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়। টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার আগে আমেরিকা, আফ্রিকা, আফগানিস্তান ইত্যাদি অনেক দেশেই তালেবান বাহিনী বোমা ফেলেছিল। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের অনেক আগেই আফগানিস্তানে তালেবান বাহিনীর উত্থান ঘটে। টুইন টাওয়ার ও আমেরিকার মিলিটারি হেডকোয়ার্টার পেন্টাগনে বোমা ফেলা হয়। অনেক মানুষ মারা যায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের প্রতিশোধ আমরা নেব। যদিও এটা এখনো প্রমাণিত হয়নি যে এই কাজ কে করেছে। কিন্তু এর পরে আমেরিকা ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে আফগানিস্তানে আক্রমণ শুরু করে। লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলে। ১০ বছর পর তারা সত্যি সত্যিই পাকিস্তানে লাদেনকে মেরে ফেলে। আফগানিস্তানের পর ইরাকে আক্রমণ চালানো হয়। সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত করে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে বিশ্ববাসীকে জানায় তারা। কিন্তু আদতে সাদ্দাম হোসেন মোটেও স্বৈরাচারী ছিলেন না। কিন্তু ছিলেন অনেকটা রাশিয়ার পক্ষের সমাজতন্ত্রী, যদিও তিনি ইসলামকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। আমেরিকা জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়ে ন্যাটো বাহিনী, নিজেদের সৈন্যসহ প্রায় আট লাখ সৈন্য ইরাকে প্রেরণ করে। পরের ইতিহাস তো আমরা দেখেছি। মিথ্যা মামলা দিয়ে সাদ্দামকে ফাঁসি দেওয়া হলো। ইরাকের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধ্বংস করে, লাখ লাখ মানুষ মেরে সেখানে এখন মিলিটারি সরকার বসানো হয়েছে।

ইরাকের পর আমেরিকা গিয়েছে লিবিয়ায়। সেখানে প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। তারা তাকে হত্যা করেছে। এরপর এসেছে সিরিয়ায়। সিরিয়ায় আক্রমণ করার পর রাশিয়া, চীন এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তারা এক হয়ে বলেছে, আমরা আর চুপ থাকব না। মার্কিনিরা এখনো সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উৎখাত করতে পারেনি। সেখানে এখন গণতন্ত্র চলছে। তালেবান বাহিনীর কিছুটা ক্ষয়ে আসার পরে দেখা যায় আইএস গড়ে ওঠে। আমি কথাটা এভাবে বলতে চাই, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আইএস, আল-কায়েদা ইত্যাদি উগ্র ইসলামি দল গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর প্রতিক্রিয়ায়।

আইএসের ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা

প্রশ্ন: আইএসের ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণায় অনেকে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বা দিচ্ছে। এর কারণ কী?

উত্তর: দেখুন, ইসলাম ১৪০০ বছর ধরে আছে। কিন্তু বেহেশতে যাব—এই বলে তো কখনোই কেউ মানুষ মারতে যায়নি। জিহাদের ধারণাও আছে, কিন্তু জেহাদ করতে হবে বলে অতীতে কেউ গুপ্তহত্যার লাইন নেয়নি। তাহলে এটা বোঝা দরকার যে, কোথাও বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর জনগণের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়েছে। তারা তাদের রাষ্ট্রের স্বাধীনতা চায়। তাদের সরকার উৎখাত করতে হলে তারা নিজেরা করবে। অন্য রাষ্ট্র সেখানে মিলিটারি আক্রমণ কেন চালাবে? এই বোধ সাধারণ মানুষের মধ্যে আছে—আমরা একটা জাতি, এই জাতিবোধের ধারণা আরব জাতিগুলোর মধ্যে আছে; আলাদা আলাদাভাবে রয়েছে। এটাকেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন বিকশিত হতে দিচ্ছে না। তাদের নেতাদের বিকাশের সুযোগ দিচ্ছে না। তাদের নেতাদের মেরে ফেলছে। এর ফলে সেখানে বহু লোকের মধ্যে তীব্র হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হতাশা বেশি। এই হতাশা থেকে তারা উগ্রপন্থা অবলম্বন করছে। তালেবান, আল-কায়েদা, আইএস ইত্যাদি গঠন করেছে।

মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তালেবান, আইএস, আল-কায়েদার উত্থানে আমেরিকার ভূমিকা আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পেছনে তালেবানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানদের গড়ে তোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অর্থ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, ট্রেনিং দিয়েছে, সর্বাত্মক সহায়তা করেছে। এখন এসে তালেবানরা আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা নিজেদের কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা চাইছে। দুনিয়ার অনেক কিছুই এখন আইএস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিকাশ

প্রশ্ন: আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা কীভাবে বিকশিত হচ্ছে?

উত্তর: আমাদের এখানে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে সুস্থিরভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সব সময়ই আমরা কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল থেকেছি। একাত্তরের পর জাসদের নেতা মেজর জলিল আফগানিস্তান থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে আফগান স্টাইলের বিপ্লব করব।’ আমাদের আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, পরে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে বাকশাল করেছিলেন। তিনিও আফগানিস্তান ঘুরে এসে বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে এমন একটি বিপ্লব করব।’ সিপিবি সভাপতি মোহাম্মদ ফরহাদও ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমরা আফগানিস্তানের মতো বিপ্লব করব।’ কথাটা বলা সহজ। কিন্তু তারা তো বিপ্লবের ধারে-কাছেও যাননি। আফগানিস্তানের বিপ্লব ছিল ষড়যন্ত্রমূলক, মিলিটারি স্টাইলের। বাংলাদেশে সেটা সম্ভব ছিল না। ফলে তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কমিউনিস্টরা বিপ্লব করবে বলেছিল, কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তারা ছিল নাস্তিক। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় ইসলামী শক্তি, তাবলিগ জামাত, সুফি ইত্যাদির প্রভাবে সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি ধর্মের দিকে ঝুঁকছে। এই ঝোঁকটা তো ছিল না। প্রথমে এখানে এলো জেএমবি। বিএনপি সরকার জেএমবিকে নির্মূল করার চেষ্টা করে। জেএমবি একসঙ্গে ৬০টি জেলায় বোমা হামলা করেছিল। পরে সরকার জেএমবি, হিযবুত তাহরীর ইত্যাদি সংগঠন নিষিদ্ধ করে। ইতিহাসের চাকা বারবারই পেছনের দিকে ঘুরেছে। এটা বামপন্থী সংগঠন, আওয়ামী লীগ বুঝতে চায়নি।

ব্লগার হত্যার কারণ

প্রশ্ন: গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে ব্লগার হত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা ইত্যাদি বিস্তৃত হয়েছে—এমন মত অনেকে পোষণ করে। ব্লগার-প্রকাশক হত্যার কারণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

উত্তর: গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠারও একটা বিশেষ বাস্তবতা ছিল। জামায়াতে ইসলামী নেতা কাদের মোল্লার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠে। পরে এই মঞ্চের দাবির কারণে ট্রাইব্যুনাল পুনরায় রায় দিতে বাধ্য হন। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলার সময়ই একজন ব্লগার রাজিব খুন হয়। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন প্রথমে কিছু বামপন্থী ছাত্রসংগঠন শুরু করলেও পরে এককভাবে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরামই নেতৃত্ব দেয়। ব্লগার হত্যাকাণ্ড, আমার মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠে। আর গণজাগরণ মঞ্চকে বিরোধিতা করে গড়ে ওঠে হেফাজতে ইসলাম। পরে আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আপোশ করেছে। অন্যদিকে ওলামা লীগ গঠন করা হয়েছে। যদিও তারাও এখন আর পুরোপুরি আওয়ামী লীগের কথা শুনছে না। এটা গেল একটা দিক।

প্রশ্ন: ব্লগার হত্যার বাইরেও আরো হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এটাকে অনেকে টার্গেট কিলিং বলছে। এসবের পেছনেও কি ধর্মীয় কারণ রয়েছে?

উত্তর: আমি শুধু পত্রিকা পড়েই তথ্য পাই, যা বলছি এগুলো সব পত্রপত্রিকার লেখা থেকেই বলছি। আমার মনে হয়, ব্লগার হত্যা যে কেন্দ্র থেকে হচ্ছে এর বাইরে যে হত্যাকাণ্ডগুলো হচ্ছে তার কেন্দ্র আলাদা। এখন পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ৯ জন ব্লগারকে। একেবারে সামনের সারির। এর বাইরেও আরো নাম না জানা অনেকে আছে। সব মিলিয়ে হয়তো ১৫ থেকে ২০ জন বলা যায়। ব্লগারের বাইরে প্রকাশক দীপনকে হত্যা করা হয়েছে ব্লগারের বই প্রকাশ করেছে বলে। এ ছাড়া প্রকাশক টুটুলকে আঘাত করা হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে গেছে। টুটুলের সঙ্গে আরো দুজন ছিল। তারাও বেঁচে গেছে। আমাদের বোঝা দরকার, ‘হোয়াট ইন দ্য পলিটিক্স বিহাইন্ড ইট’। পেছনের রাজনীতিটা কী এবং সে রাজনীতিটা কারা চালাচ্ছে? সেখানে আওয়ামী লীগের কোনো দায়িত্ব আছে কি না। বিএনপির কোনো দায়িত্ব আছে কি না। অন্য কোনো দলের কোনো দায়িত্ব আছে কি না। আমাদের বোঝা দরকার, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ডেমোক্রেটিক পার্টিরই হোক বা রিপাবলিকান পার্টিরই হোক, ব্রিটেনের সরকার লেবার পার্টিই হোক বা কনজারভেটিভ পার্টিই হোক, তাদের এই উগ্রপন্থার পেছনে ভূমিকা কী? রিগ্যান ও থেচারের (যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) যে নিউ লিবারিজম বলছেন, তার পেছনের উদ্দেশ্য কী? এখন আমরা এনজিও পাচ্ছি, সিভিল সোসাইটি পাচ্ছি, ফ্রি মার্কেট ইকোনমি পাচ্ছি; এগুলো তো রিগ্যান ও থেচারের দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদদেরই পরিকল্পনা। এটা সবারই স্বীকার করা উচিত।

উত্তরণের উপায়

প্রশ্ন: আপনি বিশ্ব পরিস্থিতি, পরিকল্পনার অংশকেই বিশেষভাবে আলোচনা করলেন, যার মধ্যে আমরা কোনো না কোনোভাবে পড়ে গেছি। এখান থেকে উত্তরণের উপায় কী?

উত্তর: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, এনজিও, সিভিল সোসাইটি কোনো না কোনোভাবে লাভবান হচ্ছে। এনজিও, সিভিল সোসাইটি তাদের অর্থেই পরিচালিত হয়। ফলে মার্কিনিদের বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। অথচ বলা উচিত। আমাদের সবারই দাবি তোলা উচিত মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো থেকে বিদেশি সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোকে আর অত্যাচার না করার। তাদের নিজেদের মতো চলতে দাও। আজ হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে। পথে মারা যাচ্ছে। সক্ষম মানুষদের এসব হচ্ছে। কী নির্মম এসব ঘটনা! আমাদের উচিত, পৃথিবীর প্রতিটি রাজধানী থেকে দাবি তোলা। এটা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হতে পারে। সরকার এখানে না-ও আসতে পারে। কারণ সরকারের অনেক কূটনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন থাকে। কিন্তু যারা স্বাধীন চিন্তা করে, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, সংগঠন, ব্যক্তি, সাংবাদিক—সবাই মিলে একটা স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। যেই ট্রাইব্যুনাল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করবে। তারা সাধারণ মানুষের পক্ষে দাবি তুলবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানাবে। আমেরিকা যখন ভিয়েতনামে যুদ্ধ চালায় তখন এমন আন্দোলন হয়েছে বছরের পর বছর। তখন বার্ট্রান্ড রাসেল একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইউরোপের সব বড় বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, শুভবুদ্ধির মানুষ এক হয়ে মানব সভ্যতার পক্ষে আওয়াজ তুলেছিলেন। পরে আমেরিকায়ও বড় বড় মিছিল হয়েছে। আন্দোলনের কারণে এক সময় ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা সৈন্য সরাতে বাধ্য হয়। এখনো দেশে দেশে রাজধানীগুলোয় এমন জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারগ্রহীতার ‘সাক্ষাৎকার সমগ্র’ গ্রন্থ থেকে অংশবিশেষ সংকলিত।