প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর: নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর: নতুন অধ্যায়ের সূচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ও নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। শুক্রবার চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলস-এ চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এই সফরকে মূল্যায়ন করতে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বাংলাদেশ কী অর্জন করল; চীন কী পেল এবং এই সফর বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে আরও শক্তিশালী করল?

সমঝোতা স্মারক ও যৌথ ঘোষণার গুরুত্ব

সফরের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৭টি সমঝোতা স্মারক। কিন্তু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো যৌথ ঘোষণা। কারণ, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকতে পারে, কিন্তু যৌথ ঘোষণা দুই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্কের দিকনির্দেশনা তুলে ধরে। যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশ ও চীন তাদের বিদ্যমান কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো–অপারেটিভ পার্টনারশিপ আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছে।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ। দক্ষিণ এশিয়ায় খুব অল্প কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের এমন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এটি স্পষ্ট যে সম্পর্ক কেবল বাণিজ্য ও উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, আনোয়ারা ও চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ সম্মেলনে প্রায় ৮০টি শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও বাংলাদেশের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিআরআই সহযোগিতার নতুন ধারা

বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার পর কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ডিজিটাল অবকাঠামোসহ নানা ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা এসেছে। যৌথ ঘোষণায় ‘উচ্চমানের বিআরআই সহযোগিতা’র উল্লেখ সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

ব্রিকস ও এসসিওতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়েও চীনের ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি ব্রিফিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্রিকসে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং চীন এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছে। একই সঙ্গে সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সঙ্গেও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা আলোচনায় এসেছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও রোহিঙ্গা সংকট

তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। চীন যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, কারিগরি সহায়তা এবং প্রকল্প পরিকল্পনায় সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু পূর্ণ অর্থায়ন বা নির্মাণের প্রতিশ্রুতি এখনো দেয়নি। রোহিঙ্গা সংকটেও চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপ সহজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অগ্রগতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

এ সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পুনঃপ্রতিফলন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ অন্য অংশীদারদের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিবাজার, জাপান দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী এবং ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট-এর মতে, "কূটনীতিতে ঘোষণা কেবল শুরু। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের ওপর। আগামী কয়েক বছরে চীনা বিনিয়োগ কতটা বাড়ে, শিল্পাঞ্চল কতটা গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান কত সৃষ্টি হয়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কত দূর এগোয়, ব্রিকস ও সম্ভাব্য এসসিওর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা কতটা অগ্রসর হয় এবং একই সঙ্গে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়—এসবই নির্ধারণ করবে এ সফরের প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব।"

তাৎক্ষণিকভাবে এ সফর হয়তো কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনেনি। তবে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত ও কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার কত দ্রুত বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয়।