ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, লেবাননের কয়েকটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত গ্রাম ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। রোববার (৫ জুলাই) ফক্স নিউজের ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’ অনুষ্ঠানে সঞ্চালক জ্যাকি হেনরিখকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের বন্ধুদের যত্ন নিই, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিষ্টানদের।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘লেবাননের খ্রিষ্টানরা হিজবুল্লাহর চরমপন্থিদের হাত থেকে রক্ষা পেতে ইসরাইলের কাছে আসতে চায়।’
ইসরাইলি হামলায় গির্জা ধ্বংস ও খ্রিষ্টান প্রতীকের অবমাননা
নেতানিয়াহুর এই দাবির সঙ্গে লেবাননে ইসরাইলের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই। ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে একাধিক গির্জা গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে। গত মে মাসে ফরাসি সংগঠন ‘ল্যুবর দোরিঅঁ’ জানায়, ইয়ারুন গ্রামে গ্রিক ক্যাথলিক ধর্মীয় সম্প্রদায় সালভাটোরিয়ান সিস্টারস-এর একটি মঠ ধ্বংস করে ইসরাইলি বাহিনী। এছাড়া গত এপ্রিলে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায় দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরাইলি সেনা ড্রিল মেশিন দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি ভাঙছেন। ইসরাইলের প্রধান রাব্বিনেট ওই ঘটনার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ইসরাইলি সেনা ভার্জিন মেরির মূর্তির অবমাননা করছেন। গত বছর দক্ষিণ লেবাননের দেরদঘায়া গ্রামে মেলকাইট গ্রিক ক্যাথলিক সেন্ট জর্জ চার্চকে বোমা মেরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় ইসরাইল।
নেতানিয়াহুর প্রমাণহীন দাবি ও আন্তর্জাতিক নিন্দা
নেতানিয়াহু তার দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। লেবাননের কোনো খ্রিষ্টান গ্রাম ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে বা সুরক্ষা চেয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি। এমনকি হিজবুল্লাহ খ্রিষ্টান গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়েছে, এমন প্রমাণও নেই। বরং লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রধান খ্রিষ্টান মিত্র হলো ‘ফ্রি প্যাট্রিয়টিক মুভমেন্ট’ (এফপিএম)। নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইসরাইল লেবাননে হামলার কারণে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির সামাজিক মাধ্যমে বলেছিলেন, ‘পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত।’ অধিকৃত দক্ষিণ লেবাননে চার ইসরাইলি সেনার মৃত্যুর পর তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা
ইসরাইলের এসব হামলা কেবল লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও গির্জার ওপর সহিংসতা বেড়েছে। এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের অন্যতম প্রধান সমর্থক গোষ্ঠী ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের কাছে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। সাক্ষাৎকারের শেষে নেতানিয়াহু দাবি করেন, ‘শুধু লেবাননের খ্রিষ্টানরাই নয়, দ্রুজ, সুন্নি ও শিয়া মুসলিমরাও আমাদের কাছে সুরক্ষা চায়।’ তবে এই গোষ্ঠীগুলোর কেউ ইসরাইলের কাছে সুরক্ষা চেয়েছে, তার কোনো প্রমাণ তিনি দেননি।
হতাহতের সংখ্যা
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরাইলি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪ হাজার ৩০৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ২০৩ জন আহত হয়েছেন।



