ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ করার আগেই নতুন হুমকি খোঁজা শুরু করেছে। এবারের হুমকি ইরানের মতো নয়; এর কোনো নির্দিষ্ট রাজধানী বা কেন্দ্র নেই। বরং এই বলয়ে রয়েছে তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী সামরিক বাহিনীসমৃদ্ধ রাষ্ট্র।
বেনেট ও নেতানিয়াহুর উদ্বেগ
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ইহুদি সংগঠনগুলোর সম্মেলনে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন, ‘তুরস্কই হলো নতুন ইরান।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, আঙ্কারা সৌদি আরবকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে এবং পারমাণবিক শক্তিসমৃদ্ধ পাকিস্তানের সঙ্গে একটি বৈরী সুন্নি অক্ষ গড়ে তুলছে।
এর পাঁচ দিন পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে একটি ‘ষড়্ভুজ জোট’ গঠনের ঘোষণা দেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এই জোট ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাফল্যের পর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সুন্নি ব্লকের মোকাবিলায় গঠিত হয়েছে।
তুরস্ক: সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য
তুরস্ককে এই সম্ভাব্য অক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী হিসেবে তুরস্কের প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার সক্রিয় সেনা রয়েছে, যার পেছনে বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ২৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। দেশটি বিশ্বের শীর্ষ মানববিহীন আকাশযান রপ্তানিকারক। তাদের তৈরি জেটচালিত যুদ্ধ ড্রোন ‘কিজিল এলমা’ ইতিমধ্যে রাডার-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আকাশে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সফল হয়েছে। চলতি বছরই এটি গণ-উত্পাদনে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ মতবাদের অধীনে তুর্কি নৌবাহিনী পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে সক্রিয়, যা ইসরায়েলের সমুদ্রবর্তী গ্যাসক্ষেত্রের কাছাকাছি।
মিসর: বদলে যাওয়া সামরিক শক্তি
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখনো ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের উদাহরণ টানেন, যখন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান মিসরের বিমানবাহিনীকে মাটিতেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মিসর সেই মিসর নয়। ২০২৬ সালে মিসরের নিয়মিত সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ, আর রিজার্ভ সেনা রয়েছে আরও ৮ লাখ। প্রতিরক্ষায় বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে মিসর মার্কিন আব্রামস ট্যাংক, ফরাসি রাফাল জেট, রুশ সু-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং জার্মান সাবমেরিনের শক্তিশালী অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে। নেতানিয়াহু নিজেও গত ফেব্রুয়ারিতে একটি রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে বলেন, ‘মিসরীয় সেনাবাহিনী শক্তিশালী হচ্ছে এবং আমাদের এটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।’
সৌদি আরব ও পাকিস্তান
সৌদি আরবের বিমানবাহিনী টাইফুন ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে গড়ে উঠেছে, যা আকারে ছোট হলেও সক্ষম। রিয়াদ এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বাইরেও নিরাপত্তা সম্পর্ক বহুমুখী করছে।
ইসরায়েলি পরিকল্পনাবিদদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করছে পাকিস্তান। কর্মকর্তাদের মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানের কাছেই কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্রাগার এবং তা বহনের উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। দেশটির বিমানবাহিনী সম্প্রতি বাস্তব যুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করেছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে চীন পাকিস্তানকে ৩৬টি জে-১০সি ফাইটার জেট সরবরাহ করেছে। ইসলামাবাদের দাবি, গত বছর ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ে এই বিমানগুলো থেকে পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়, যার মধ্যে অন্তত একটি রাফাল জেট ছিল।
বাস্তব হুমকি না রাজনৈতিক কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কোনো যৌথ আদর্শ বা যৌথ কমান্ড নেই। কায়রো ও রিয়াদের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শান্তিচুক্তি ও পর্দার আড়ালের নিরাপত্তা সমঝোতা রয়েছে, যা বাতিলের কোনো ইঙ্গিত নেই। ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্ত কেবল বলেছেন, তুরস্ক ‘এখন আর প্রান্তিক কোনো অংশীদার নয়’, বরং তারা নিজেদের একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা পণ্ডিত আন্দ্রিয়াস ক্রিগ নেতানিয়াহুর ‘ষড়্ভুজ জোট’কে পূর্বের সম্পর্কগুলোর একটি নতুন ব্র্যান্ডিং বলে অভিহিত করেছেন। চ্যাথাম হাউসের ইয়োসি মেকেলবার্গ এবং ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাস যুক্তি দেখিয়েছেন যে বেনেট ও নেতানিয়াহু—উভয়েরই নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। সামনে নির্বাচন বা সরকারি জোট টিকিয়ে রাখতে একটি ‘বাহ্যিক হুমকি’ জিইয়ে রাখা তাঁদের প্রয়োজন।
তাঁরা সতর্ক করে বলেন, আঙ্কারাকে দ্বিতীয় তেহরান হিসেবে গণ্য করতে গিয়ে ইসরায়েল হয়তো নিজেই নিজের এমন এক শত্রু তৈরি করে ফেলবে, যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই।



