গঙ্গা চুক্তির নবায়নের আলোচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি হবে ফারাক্কা ব্যারাজ অপসারণ। এই দাবি বাংলাদেশের অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হলেও ভারতের অভ্যন্তরেই এর পক্ষে জোরালো সমর্থন রয়েছে। ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে ভারতে জনমনে হতাশা বাড়ছে, কারণ এটি কলকাতাকে সমুদ্রবন্দর হিসেবে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং উজানে পলিপতন ও নদীর তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বন্যা ও পাড় ভাঙন সৃষ্টি করছে।
ভারতে ফারাক্কা ব্যারাজ অপসারণের আন্দোলন
বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণের দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ২০১৬ সালে ভারতের আন্তরাজ্য পরিষদের ১১তম সভায় নীতীশ কুমার ঘোষণা করেন যে ফারাক্কা বাঁধ উপকারের তুলনায় বেশি অপকার করেছে। তিনি ব্যারাজ অপসারণ করে গঙ্গায় বাধাহীন প্রবাহ নিশ্চিতের দাবি জানান। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাটনায় ‘অবিরাম গঙ্গা’ শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে ভারতের বহু নদী গবেষক ও কর্মী অংশ নেন। ‘ভারতের জলমানব’ খ্যাত রাজেন্দ্র সিং ফারাক্কা বাঁধকে বিহারের জন্য ‘অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেন। নদী গবেষক হিমাংশু থাক্কা উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ২০ বছর পর বাঁধের মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন, এবং ফারাক্কা বাঁধের প্রায় ৫০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সম্মেলনে ১১ দফার পাটনা ঘোষণা গৃহীত হয়, যার মূল দাবি ফারাক্কা ও অন্যান্য বাঁধ অপসারণ করে গঙ্গার প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ২০১৭ সালের মে মাসে দিল্লিতেও অনুরূপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ঐতিহাসিক চুক্তি ও পানি বণ্টন
ফারাক্কা ব্যারাজ অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে ভারত শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) ১১,০০০ থেকে ১৬,০০০ কিউসেক পানি অপসারণের অনুমতি পেয়েছিল, যাতে বাংলাদেশ ৪০,৫০০ থেকে ৪৪,৫০০ কিউসেক পেতে পারে। ১৯৭৭ সালের জিয়া সরকারের আমলের চুক্তি অনুযায়ী ভারত পানি প্রত্যাহার ২০,০০০ কিউসেকে সীমাবদ্ধ রাখে, যাতে বাংলাদেশ ৩৫,০০০ কিউসেক পায়; এতে ‘ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতি’ ধারা ছিল, যা অনুযায়ী বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ ২৭,৬০০ কিউসেকের কম হবে না। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ আমলের চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কায় প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০,০০০ কিউসেক অপসারণ করবে; প্রবাহ ৭০,০০০-৭৫,০০০ কিউসেক হলে বাংলাদেশ ৩৫,০০০ কিউসেক পাবে; এবং ৭০,০০০ কিউসেকের কম হলে সমান ভাগ হবে। তবে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতি নেই, যা উদ্বেগজনক।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৭-২০১০ সময়কালে ফারাক্কায় গঙ্গার গড় প্রবাহ প্রতি বছর ২,১৩২ কিউসেক হ্রাস পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই হ্রাস আরও বেশি। ১৯৯৭-২০১৬ সময়কালে ৫২ শতাংশ সময় বাংলাদেশ তার প্রাপ্য পানি পায়নি; মার্চ থেকে মে মাসে এই অনুপাত ছিল ৬৫ শতাংশ।
ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতি ও অন্যান্য প্রস্তাব
গঙ্গা চুক্তির নবায়নে ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতিমূলক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যা কমপক্ষে ৩৫,০০০ কিউসেক নির্ধারিত হওয়া উচিত। কলকাতা আর সমুদ্রবন্দর না থাকায় ভাগীরথীর দিকে পানি অপসারণ ভারতের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বাংলাদেশে গঙ্গার কোনো উপনদী নেই, বরং অসংখ্য শাখা-প্রশাখা গঙ্গার প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ২০১৩ সালে ‘নদীর বিনিময়ে ট্রানজিটের’ প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার বিনা শর্তেই ভারতকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ বাতিল করা হয়, যা দেখায় যে আগের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা যায়।
আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
গঙ্গা চুক্তির নবায়নে ভারতের অভ্যন্তরে সমর্থন ও সহানুভূতি অর্জন করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধারায় প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউনেস্কো ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে সুন্দরবনের অবক্ষয় ও ভারতের নদী-সংযোগ প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণার সুযোগ তৈরি করে। তবে কোনো সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়নি।
ভারতের উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্যের উন্নয়নে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমতি এবং বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা। আশা করা যায়, ভারত বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং ৩৫,০০০ কিউসেকের ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা মেনে নেবে।
যৌথ নদী কমিশনের পুনর্গঠন ও গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প
বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশন বর্তমানে আমলানির্ভর এবং এতে প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও নদী-সংক্রান্ত দর্শনের বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। কমিশনের যথাযথ পুনর্গঠন প্রয়োজন। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন আত্মহননমূলক পদক্ষেপ, যা গঙ্গা চুক্তির নবায়নে বাংলাদেশের দাবি দুর্বল করবে। ভারতের আলোচকরা বাংলাদেশের অবস্থানের স্ববিরোধিতা উন্মোচন করে দাবি নাকচ করতে পারবেন। তিনি সরকারকে প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।



