চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর: বাংলাদেশের সম্ভাবনা

চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য কতটা সুবিধাজনক হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের করিডোর বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। আবার অনেকের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কী অর্জন হবে, সে বিষয়ে আগে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। বিশেষ করে এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে, সেটিও বিশ্লেষণ করা দরকার।

বৈঠকের পর ব্রিফিং: কী বললেন মুখপাত্র?

শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের পর এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, এই অর্থনৈতিক করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও লেনদেন বৃদ্ধি করা এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নেওয়া।

দেশে ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মাহদী আমিন বলেন, ‘এখানে তো অবশ্যই আমরা চাই, ব্যবসার প্রসার হোক, বাণিজ্যে প্রসার হোক। তাহলে বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হবে। নতুন ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, ট্রেড ভলিউম বাড়বে। সুতরাং আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই প্রস্তাবের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো এখনও একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়নি। প্ল্যানিং স্টেজে যাবে এবং ফিজিবিলিটি করা হবে। বাট ইন জেনারেল আমরা তো চাই শুধু নির্দিষ্ট কোনও দেশ না, এর মাধ্যমে সাউথ-ইস্টের অন্যান্য দেশের মার্কেটেও একটা অবারিত উৎস তৈরি হবে। আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে হয়তো বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুতরাং অবশ্যই এটা আমরা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছি।’

এটা একটা ‘বিশাল মহাপরিকল্পনা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে, সামনের দিনগুলোতে এটি নিয়ে ডিটেইল স্টাডি করা হবে এবং আলোচনা করা হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে রাজনীতিকদের মতামত জানার চেষ্টা করে বাংলা ট্রিবিউন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে চীনের পক্ষ থেকে করিডোর-সংক্রান্ত যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটি নিশ্চয়ই সরকার পর্যালোচনা করে দেখবে।’

তিনি বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশ এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন চীন হয়তো অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আবারও এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আমাদের সরকার এখনও এ বিষয়ে হ্যাঁ বা না—কিছুই বলেনি। আমি বিশ্বাস করি, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চীনের পক্ষ থেকে করিডোরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের সরকার এখনও এ বিষয়ে হ্যাঁ বা না; কিছুই বলেনি। এর মাধ্যমে আমাদের কোনো লাভ হবে কি না, নাকি সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই শুধু দিয়ে যাবো—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। নিশ্চয়ই সরকারের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। এরপর আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া জানাবো।’

তিনি বলেন, ‘দেশের যেকোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্তের সঙ্গে থাকবে জামায়াত। এ বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যার পর জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোট আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে।’

সিদ্ধান্ত যাই হোক, এ বিষয়ে সবার মতামত নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চীনের এই প্রস্তাব অবশ্যই পর্যালোচনা করা জরুরি। কারণ এটি একটি ভূরাজনৈতিক বিষয়। অতীতে আমাদের একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে করিডোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেখানে এক ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সব অংশীজনের মতামত নিয়ে এগোতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফরকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাই। তবে এর মাধ্যমে আমাদের প্রাপ্তি কতটুকু, সেটিই দেখার বিষয়।’

অন্যদিকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংসদে আলোচনা করার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করিডোরের বিষয়ে চীনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাই। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই জাতীয় সংসদে আলোচনা করতে হবে। চীনের প্রস্তাবের ফলে আমাদের কী কী সুবিধা হতে পারে, সেগুলো আগে বিবেচনায় আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি, মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে করিডোর নেওয়ার শর্তে চীন হয়তো বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকৃতই যদি এমনটি হয়ে থাকে, সেটিও ইতিবাচক দিক। আরেকটি বিষয় হলো, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে করিডোর-সংক্রান্ত সমঝোতাকে আরাকান অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কীভাবে দেখে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।’

‘যেকোনও স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারকে অবশ্যই অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

সুযোগ হিসেবে দেখছেন মজিবুর রহমান মঞ্জু

করিডোরের প্রস্তাবকে সুযোগ হিসেবেই দেখছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘যতদূর জানি, এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতাভুক্ত একটি পরিকল্পনা। আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে এই করিডোরের চিন্তা করা হচ্ছে। বহুমাত্রিক পরিবহন সংযোগ স্থাপন এবং আন্তসীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতি সম্প্রসারণই এর উদ্দেশ্য। আমি মনে করি, এ ধরনের করিডোর বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে নতুন মাত্রা যোগ করবে।’