বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ১৭ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, নতুন অধ্যায়ের সূচনা
বাংলাদেশ-চীনে ১৭ এমওইউ, নতুন অধ্যায় শুরু

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টায়) সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ তথ্য জানান।

১৭ এমওইউ স্বাক্ষর: বিস্তারিত বিবরণ

মাহদী আমিন বলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী ও চীনের নেতৃত্বের সম্মতির ভিত্তিতে এমওইউগুলো স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে ১৩টি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের এবং ১টি রাজনৈতিক দল পর্যায়ে স্বাক্ষরিত হয়, যা বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা দুই দেশের রাজনৈতিক দলের মধ্যে।

যৌথ ইশতেহারে ১৬ পয়েন্ট

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, এই সফরের ভিত্তিতে একটি যৌথ ইশতেহার প্রণীত হচ্ছে, যাতে ১৬টি পয়েন্ট থাকবে। সফরের বিস্তারিত বোঝাপড়া ও ঐকমত্য সেখানে লিপিবদ্ধ করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, চীনের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ও চীনের ৫০ বছরের সম্পর্ক স্থাপনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

মাহদী আমিন বলেন, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি সীমিত হলেও চীন থেকে আমদানি বেশি। বাণিজ্য ব্যবধান কমাতে উৎপাদন সক্ষমতা আছে এমন খাত চিহ্নিত করে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর আলোচনা হয়েছে। চীনের কারখানা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে—এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে চীন। বিনিয়োগে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অবকাঠামো ও জ্বালানি

চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপ্তি বাড়াতে চায় চীন। সড়ক, সেতু, রেলসহ মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। মংলা ইকোনমিক জোন, গ্রিন এনার্জি ও টেকসই উন্নয়নে চীন অগ্রাধিকার দিতে চায়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে চীন পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পানি ব্যবস্থাপনা

তিস্তা প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি সহায়তা দিতে চায়। পানি ব্যবস্থাপনায় চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

অর্থনৈতিক করিডর ও বন্দর

বাংলাদেশ ও চীনকে সংযুক্ত করে একটি ইকোনমিক করিডর তৈরির প্রস্তাব এসেছে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসার। চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করে আঞ্চলিক হাবে পরিণত করার এবং মংলা বন্দরকে আরও সেবামুখী করার বিষয়ে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনগণের সম্পর্ক

তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চীনা ভাষা শিক্ষায় শিক্ষক ও অবকাঠামো সহায়তা দেবে চীন। স্বাস্থ্যখাতে রোবটিক সার্জারি ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। বাংলাদেশিদের চীনে চিকিৎসার জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করবে। সংস্কৃতি, মিডিয়া, প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ে জনগণের সম্পর্ক আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রোহিঙ্গা ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে চীন মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রথমবারের মতো ফরেন ও ডিফেন্স বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ বোঝাপড়া হয়েছে। চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানিয়েছে।

বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও নতুন অধ্যায়

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় চীন সহযোগিতা করবে। ব্রিকস সদস্যপদে বাংলাদেশের আবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, এই সফর দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও বিশ্বস্ত সম্পর্কের নতুন রূপরেখা তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন অধ্যায় সূচিত করবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হকসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।