বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ১৩ সমঝোতা স্মারক সই, বিনিয়োগ সহযোগিতায় জোর
বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ১৩ এমওইউ সই, বিনিয়োগে জোর

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা, সবুজ উন্নয়ন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচিত বিষয়

বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রূপরেখা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবর অনুযায়ী, বৈঠকে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেন, 'কৌশলগত পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় করতে, বাস্তবমুখী সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে এবং উভয় দেশের জনগণের জন্য আরো বেশি সুফল বয়ে আনতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত রয়েছে।' চীন ও বাংলাদেশ ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে চীন দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন করে এবং নতুন সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থন রয়েছে।'

তিনি আরো বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চমানের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' সহযোগিতা এগিয়ে নিতে, বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি উন্নত মানের পণ্য আমদানি করতে, সক্ষম চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে সহায়তা করতে এবং নতুন জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য-যোগাযোগের মতো উদীয়মান শিল্পখাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য

সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ সরকার 'এক-চীন' নীতিতে দৃঢ়ভাবে অবিচল এবং যে কোনো ধরনের 'তাইওয়ান স্বাধীনতা'র বিরোধী।' বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে চীনের সহায়তায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং উভয় দেশের উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে আগ্রহী।'

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

গতকাল বিকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সাংবাদ সম্মেলনে জানান, সমঝোতা স্মারকগুলো মূলত বিনিয়োগ সহযোগিতা, সবুজ উন্নয়ন (গ্রিন ডেভেলপমেন্ট) ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সই করা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, 'আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি বিষয়েও একটা এমওইউ হয়েছে।' তিনি বলেন, 'টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে সহযোগিতায় দুটো পৃথক এমওইউ হয়েছে। গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।'

চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং আমাদের অন্যতম দীর্ঘদিনের ও বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।' তিনি বলেন, 'আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।' তিনি বলেন, তার সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনতে একটি ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তিস্তাসহ নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী লি গোওইং। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। গতকাল দুপুরে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা চান। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

শি জিনপিং-তারেক রহমান বৈঠক আজ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরের শেষদিন আজ শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে বৈঠক হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এ বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর আজ গ্রেট হলে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং চীনের জাদুঘর পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।