ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমলেও ৫ খাতের ব্যবসা জমজমাট
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। যুদ্ধের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল, গ্যাস, রাসায়নিক ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য আটকা পড়েছে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে এই সংকটের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতির কিছু খাত ভালো করছে, যার মধ্যে পাঁচটি শিল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ ব্যাংক: অস্থিরতায় মুনাফার সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই অস্থিরতা বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। মর্নিং স্টার রিসার্চ সার্ভিসের শেয়ারবাজারের আর্থিক পরিস্থিতি গবেষণা পরিচালক শন ডানল্যাপের মতে, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলো লাখ লাখ ডলার আয় করছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মর্গান স্ট্যানলি ৫৫৭ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। গোল্ডম্যান স্যাকস ৫৬৩ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা ১৯ শতাংশ বেড়েছে। জেপি মর্গান চেজের আয় ১ হাজার ৬৪৯ কোটি ডলার, যা ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ডানল্যাপ সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা এই সুসময় শেষ করতে পারে।
ভবিষ্যদ্বাণী প্ল্যাটফর্ম: যুদ্ধের বাজিতে রমরমা ব্যবসা
ক্রিপ্টো-ভিত্তিক পূর্বাভাস প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করছে। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের যুদ্ধের ফলাফলের মতো বিতর্কিত বিষয়ে বাজি ধরার সুযোগ দেয়। ৩০ মার্চ ফি কাঠামো পরিবর্তনের পর ১ এপ্রিল থেকে প্ল্যাটফর্মটি ফি বাবদ ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছে।
ডেফিলামার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে পলিমার্কেট এই বছর ফি বাবদ ৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করতে পারে। তবে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো গোপন তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
মহাকাশ গবেষণা ও প্রতিরক্ষা খাত: সংঘাতে ব্যয় বৃদ্ধি
ইউক্রেন, ইরান, সুদান, গাজা ও লেবাননে সংঘাত এবং বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় মহাকাশ গবেষণা ও প্রতিরক্ষাশিল্পে সুসময় যাচ্ছে। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশ তাদের সামরিক বাজেট বাড়িয়েছে।
এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড অ্যারোস্পেস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনডেক্স গত মার্চ শেষে এই খাতে বার্ষিক ৩২ শতাংশ নিট মুনাফার কথা জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের সামগ্রিক সূচককে ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: স্থিতিশীলতা বজায়
ইরান যুদ্ধ সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষক নিক মারো বলেন, পূর্ব এশিয়া থেকে সেমিকন্ডাক্টর চিপ রপ্তানি বৃদ্ধি এই খাতের শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। তাইওয়ান গত মার্চ মাসে ৮ হাজার ২০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৫৭ হাজার ২৮০ কোটি নিউ তাইওয়ান ডলার আয় করেছে, যা ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জ্বালানি নিরাপত্তার চাপ
ইরান যুদ্ধ জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত সরে আসার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫০টি দেশে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানি প্রসারে সক্রিয় নীতিমালা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশ সৌর প্যানেলে কর ছাড় এবং নতুন প্রকল্প চালু করেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশন ইনডেক্স গত বছরের তুলনায় ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।



