মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও জ্বালানিসংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতির মারাত্মক হুমকি
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির হুমকি

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও জ্বালানিসংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতির মারাত্মক হুমকি

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির গতিপথকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলিয়াছে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। বিজিএমইএর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, জ্বালানিসংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাবে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলির উৎপাদন-সক্ষমতা ইতিমধ্যে ২৫-৩০ শতাংশ হ্রাস পাইয়াছে। বিশেষ করিয়া, গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং এবং জেনারেটর চালাইবার জন্য পর্যাপ্ত ডিজেলের অভাবে পণ্য শিপমেন্ট বিঘ্নিত হইতেছে।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বিকল্প বিদ্যুতের বাধা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বহুলাংশে বাড়িয়া গিয়াছে। উল্লেখ্য যে, সোলার প্যানেলসহ পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতির উপর ২৮.৭৩ শতাংশ হইতে ৬১.৮০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান থাকায় বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গ্রহণও কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হইলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক জিডিপিতে ইহার নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হইবে।

বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা ও বৈশ্বিক প্রভাব

কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এক নির্মম সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছেন। তাহার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি 'ক্যাসকেডিং' বা ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলিবে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হইলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়া যাইতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৯ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পাইবার আশঙ্কা রহিয়াছে। ২০২৬ সালের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশ হইতে হ্রাসপূর্বক ২.৬ শতাংশে নামিয়া আসিতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এশিয়ার ভয়াবহ পরিস্থিতি ও আর্থিক ক্ষতি

এইদিকে এশিয়ার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক। ইউএনডিপির মতে-এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৯ হাজার ৭০০ কোটি হইতে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে ঠেকিতে পারে, যাহা এই অঞ্চলের জিডিপির প্রায় ০.৩ শতাংশ হইতে ০.৮ শতাংশ। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আকাশচুম্বী দাম এশিয়ার উৎপাদনশীল দেশগুলিকে খাদের কিনারে ঠেলিয়া দিয়াছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতে-এই অঞ্চলের মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৩.৬ শতাংশে পৌছাইতে পারে।

এশিয়ার গুরুত্ব ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব

আমরা জানি, এশিয়া বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল মহাদেশ। বৈশ্বিক উৎপাদনযজ্ঞের অর্ধেকের বেশি হয় এই অঞ্চলেই। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব সমগ্র বিশ্বেই পড়িতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানিসংকটে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত এশিয়ার দেশগুলি, বিশেষত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইন বর্তমানে বিকল্প উৎস হইতে জ্বালানি সংগ্রহের প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে।

প্রস্তাবিত সমাধান ও পদক্ষেপ

এমতাবস্থায় বর্তমানে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলিকে জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে শুল্ক রেয়াতসহ বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করিতে হইবে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ডিসি কেবল এবং বিইএসএসের মতো অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক (২৮.৭৩ শতাংশ থেকে ৬১.৮০ শতাংশ) কমাইয়া ১ শতাংশে নামাইয়া আনিতে হইবে। ইহা ছাড়া বাংলাদেশের উচিত দ্রুত ফিলিং স্টেশন হইতে কারখানাসমূহে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমদানিকৃত জ্বালানির উপর হইতে সকল প্রকার ভ্যাট ও কর প্রত্যাহার করিয়া উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে সচেষ্ট হওয়া। বিশেষ করিয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য জরুরি গ্যাস-সংযোগ ও শিল্পকারখানায় ইভিসি মিটার স্থাপন জরুরি।

খাদ্যসংকটের সম্ভাবনা ও কৃষিতে মনোযোগ

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে-সার ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী ৪ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রহিয়াছে। যদি অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি দিয়া পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক না হয় এবং সারের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহা হইলে এশিয়ায় দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাওয়া বিচিত্র নহে। সুতরাং, সম্ভাব্য খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সার-বীজ সরবারহসহ সামগ্রিকভাবে কৃষিতে মনোযোগ বাড়াইতে হইবে। এই মুহূর্তে পরিত্যক্ত বা অবহেলায় পড়িয়া থাকা জমিও চাষাবাদের আওতায় আনিয়া অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানই হইবে বুদ্ধিমানের কাজ।