মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তেলের দামে ওঠানামা: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় আশার আলো
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তেলের দামে ওঠানামা, আলোচনায় আশা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তেলের দামে ওঠানামা: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় আশার আলো

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর আজ মঙ্গলবার কিছুটা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা হ্রাস পেয়েছে। এই ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাবেই আজ এশিয়ার প্রাথমিক লেনদেনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

বিশ্ববাজারে তেলের দামের অবস্থা

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৮ দশমিক ৪০ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম আরও বেশি, প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৯৭ দশমিক ৪০ ডলারে অবস্থান করছে। এই দাম হ্রাসের পেছনে মূল কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার প্রেক্ষাপট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ট্রাম্পের মতে, তেহরান ‘খুব মরিয়া হয়ে’ ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চাইছে। গত শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদে আলোচনায় বসেছিল। প্রায় ২১ ঘণ্টা ব্যাপী আলোচনা শেষে রোববার সকালে এই বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই সমাপ্ত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধের নির্দেশ দিলে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। তবে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান পাঁচ বছর পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে ২০ বছরের শর্তে অনড় থাকে। প্রতিবেদনটিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রস্তাব আদান-প্রদান করলেও এখনো চুক্তি থেকে অনেক দূরে রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে এবং সামনাসামনি দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনাও রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি সংকট ও এর প্রভাব

উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলোয় ইরান যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। হরমুজ প্রণালি এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইরান এই প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। তারপর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের সচিব ক্রিস রাইট সোমবার বলেন, এই জলপথ কার্যত বন্ধ থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তিনি ওয়াশিংটনে আয়োজিত সেমাফোর ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমরা জ্বালানির উচ্চ মূল্য দেখতে থাকব। এমনকি তা আরও বাড়তেও পারে।’

এশিয়ার শেয়ারবাজারের অবস্থা

আজ মঙ্গলবার এশিয়ার শেয়ারবাজারেও কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কেওএসপিআই সূচক ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঊর্ধ্বগতিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনার ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নতুন করে আশার সঞ্চার করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই আলোচনা সফল হয়, তাহলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে এবং তেলের দাম আরও স্থিতিশীল হতে পারে। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালি সংকট চলতে থাকলে জ্বালানির দাম বাড়তেই থাকবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।